পাঠ ৮ / ১৪অনুচ্ছেদ ৩.৭–৩.৮.১
আয়নিক ও সমযোজী বন্ধন, সিগমা ও পাই বন্ধনIonic & covalent bonds, orbital overlap, σ and π
রান্নার লবণ (common salt, NaCl) তৈরি হয় নরম, চকচকে ধাতু সোডিয়াম (sodium, Na) আর বিষাক্ত সবুজ গ্যাস ক্লোরিন (chlorine, Cl₂) থেকে। বই বলে, সোডিয়াম একটি ইলেকট্রন (electron) দিয়ে দেয় আর ক্লোরিন সেটি নেয় — দুজনেরই অষ্টক (octet) পূর্ণ হয়। নিচে নিজে ইলেকট্রনটি সরিয়ে দেখো, আর শক্তির মিটারে (energy meter) চোখ রাখো:
সোডিয়ামের (sodium, Na) বাইরের খোলসে (outer shell) একটি মাত্র ইলেকট্রন (electron)। হলুদ ইলেকট্রনটি টেনে ক্লোরিনের (chlorine, Cl) খোলসের ফাঁকা জায়গায় নিয়ে যাও।
বৃত্তের আকার পরমাণু ও আয়নের প্রকৃত ব্যাসার্ধের (radius) অনুপাতে।
- Na-এর 3s ইলেকট্রন Cl-কে দাও।
- Na⁺ আর Cl⁻-কে কাছে আনো।
- মিটারের দুই ধাপ তুলনা করো: কোনটি বড়?
ইলেকট্রন দিতে-নিতে শক্তি বাড়ল (+147 kJ/mol) — অর্থাৎ শুধু অষ্টক পূর্ণ হওয়া লাভজনক নয়! তাহলে NaCl তৈরি হয় কেন? আর হাইড্রোজেন বা ক্লোরিনের মতো অধাতু (non-metal) নিজেদের মধ্যে কীভাবে বন্ধন গড়ে, যেখানে কেউ ইলেকট্রন ছাড়তে রাজি নয়?
এই পাঠে ধাপে ধাপে এগোব:
- পরমাণু কেন বন্ধন গড়ে — শক্তি কমানো (lower energy), অষ্টক নিয়ম (octet rule) ও তার সীমা
- আয়নিক বন্ধন (ionic bond) — ইলেকট্রন স্থানান্তর (electron transfer) আর জালক শক্তি (lattice energy)
- আয়নিক যৌগের ধর্ম (properties of ionic compounds)
- সমযোজী বন্ধন (covalent bond) — লুইস গঠন (Lewis structure), বন্ধন জোড় (bond pair) ও নিঃসঙ্গ জোড় (lone pair)
- যোজনী বন্ধন তত্ত্ব (valence bond theory) — অরবিটালের অধিক্রমণ (orbital overlap)
- সিগমা (σ) ও পাই (π) বন্ধন
- বন্ধন দৈর্ঘ্য (bond length) ও বন্ধনশক্তি (bond energy)
- এবার নিজে করে দেখো — সিমুলেশন (simulation)
ধাপ ১: পরমাণু কেন বন্ধন গড়ে
দুটি পরমাণু তখনই জোড়া লাগে যখন জোড়া অবস্থায় তাদের মোট শক্তি কম থাকে আলাদা অবস্থার চেয়ে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বল যেমন নিচে গড়িয়ে স্থির হয়, তেমনি পরমাণুও কম শক্তির, বেশি স্থিতিশীল (stable) অবস্থায় যেতে চায়। বন্ধন গড়ার সময় যে শক্তি বেরিয়ে যায়, বন্ধন ভাঙতে ঠিক ততটা শক্তি দিতে হয় — এটিই বন্ধনশক্তি (bond energy)।
রাসায়নিক বন্ধন (chemical bond): যে আকর্ষণ বল (force of attraction) দুটি পরমাণু বা আয়নকে একসঙ্গে ধরে রাখে। এই আকর্ষণ আসে ইলেকট্রন স্থানান্তর (transfer, আয়নিক বন্ধন) বা শেয়ার (sharing, সমযোজী বন্ধন) থেকে — এবং দুই ক্ষেত্রেই আসল শক্তি তড়িৎ আকর্ষণ (electrostatic attraction): ধনাত্মক নিউক্লিয়াস বা আয়নের সঙ্গে ঋণাত্মক ইলেকট্রন বা আয়নের।
কোন পরমাণু কী করবে, তা ঠিক করে দুটি পর্যায়বৃত্ত ধর্ম (periodic properties), যা আগের দুই পাঠে শিখেছ:
- আয়নীকরণ শক্তি (ionisation energy, IE) — ইলেকট্রন ছাড়তে কত শক্তি লাগে। গ্রুপ 1 ও 2-এর ধাতুর IE কম।
- ইলেকট্রন আসক্তি (electron affinity, EA) ও তড়িৎ ঋণাত্মকতা (electronegativity) — ইলেকট্রন নিলে কত শক্তি বের হয়, বন্ধনের ইলেকট্রন কে কতটা টানে। গ্রুপ 16 ও 17-এর অধাতুর এগুলো বেশি।
অষ্টক নিয়ম (octet rule): বন্ধনের পর অনেক পরমাণুর যোজ্যতা স্তরে (valence shell) 8টি ইলেকট্রন থাকে — নিকটতম নিষ্ক্রিয় গ্যাসের (noble gas) মতো (H-এর ক্ষেত্রে 2টি, He-এর মতো, একে বলে দ্বিত্ব, duet)। লুইস গঠন আঁকার জন্য এটি দারুণ কাজের নিয়ম। কিন্তু মনে রাখো, এটি পথপ্রদর্শক, আইন নয়:
দুটি পরমাণুর মধ্যে বন্ধন গঠনের মূল কারণ কী?
ধাপ ২: আয়নিক বন্ধন — স্থানান্তর আর জালক শক্তি
কম IE-র ধাতু (metal) আর বেশি EA-র অধাতু (non-metal) মুখোমুখি হলে ধাতু থেকে অধাতুতে ইলেকট্রন স্থানান্তরিত হয়। তৈরি হয় ধনাত্মক আয়ন (cation) আর ঋণাত্মক আয়ন (anion), আর বিপরীত আধানের (opposite charges) তড়িৎ আকর্ষণে তারা আটকে যায়।
আয়নিক বা তড়িৎযোজী বন্ধন (ionic / electrovalent bond): ধাতু থেকে অধাতুতে এক বা একাধিক ইলেকট্রন স্থানান্তরে সৃষ্ট ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নের মধ্যকার তড়িৎ আকর্ষণ বল।
খোলসভিত্তিক ইলেকট্রন বিন্যাস (electron arrangement) দিয়ে দেখলে:
যৌগের সংকেত (formula) আসে আধানের ভারসাম্য (charge balance) থেকে: মোট ধনাত্মক আধান = মোট ঋণাত্মক আধান। যেমন Ca²⁺ ও F⁻ থেকে CaF₂, Al³⁺ ও O²⁻ থেকে Al₂O₃ (2 × 3 = 3 × 2 = 6)।
শক্তির হিসাব: আসলে কে “দাম” মেটায়?
হুকে দেখেছ, গ্যাসীয় Na আর Cl থেকে আয়ন বানাতে শক্তি লাগে:
কোনো ধাতু–অধাতু জোড়ার জন্যই এই সংখ্যা ঋণাত্মক হয় না: সবচেয়ে কম IE-র সিজিয়াম (Cs, 376) আর সবচেয়ে বেশি EA-র ক্লোরিন (Cl, 349) নিলেও kJ/mol। তাহলে লাভ কোথা থেকে? উত্তর: জালক শক্তি (lattice energy) — গ্যাসীয় আয়নগুলো কাছে এসে কেলাস জালক (crystal lattice) গড়লে যে বিশাল শক্তি বেরিয়ে যায়। NaCl-এর জন্য তা 787 kJ/mol, যা 147-এর খরচ সহজেই মিটিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত (extension) — বর্ন-হেবার চক্র (Born–Haber cycle): বইয়ে পুরো চক্রটি নেই, কিন্তু আয়নিক বন্ধন কেন হয় তা এটিই বোঝায়। কঠিন সোডিয়াম আর ক্লোরিন গ্যাস থেকে NaCl পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের শক্তি নিচে নিজে যোগ করো।
শুরু: কঠিন সোডিয়াম (Na(s)) আর ক্লোরিন গ্যাস (½Cl₂(g))। “পরের ধাপে” চাপ দিয়ে NaCl(s) পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে চলো।
উপাত্ত (data): NIST-JANAF / CODATA। জালক শক্তি 787.2 এই চক্র থেকেই বের করা হয়।
তাই কোন আয়ন তৈরি হবে, তা ঠিক করে খরচ বনাম লাভ। Mg²⁺ বানাতে IE₂ বাড়তি দিতে হয়, কিন্তু দ্বিধনাত্মক ছোট আয়ন অনেক বড় জালক শক্তি দেয় — তাই MgCl নয়, MgCl₂ তৈরি হয়। আবার Na²⁺ বানাতে IE₂ = 4562 kJ/mol লাগে (পূর্ণ 2p খোলস ভাঙতে হয়), যা কোনো জালক শক্তি পোষাতে পারে না — তাই NaCl₂ হয় না। সিমুলেশনে এটি নিজে যাচাই করবে।
Na(g) + Cl(g) → Na⁺(g) + Cl⁻(g) ধাপে শক্তি +147 kJ/mol। তবু NaCl কেন তৈরি হয়?
ধাপ ৩: আয়নিক যৌগের ধর্ম
আয়নিক যৌগে আলাদা আলাদা “অণু” (molecule) নেই। প্রতিটি আয়নের চারপাশে বিপরীত আধানের আয়ন সব দিকে সমানভাবে সাজানো — আয়নিক বন্ধন অদিক (non-directional), যেকোনো দিক থেকেই আকর্ষণ সমান। NaCl-এ প্রতিটি Na⁺-এর চারপাশে 6টি Cl⁻, প্রতিটি Cl⁻-এর চারপাশে 6টি Na⁺। NaCl একটি সংকেত একক (formula unit), অণু নয়।
এই গঠন থেকেই ধর্মগুলো আসে:
| ধর্ম (property) | কারণ |
|---|---|
| উচ্চ গলনাঙ্ক (high melting point) — NaCl 801 °C, CaF₂ 1418 °C, MgO 2825 °C | জালকের সব আয়নকে আলাদা করতে বিশাল শক্তি লাগে; আধান বেশি ও আয়ন ছোট হলে আরও বেশি |
| শক্ত কিন্তু ভঙ্গুর (hard but brittle) | আঘাতে একটি স্তর সরলে সমধর্মী আধান মুখোমুখি হয়, বিকর্ষণে কেলাস ভাঙে |
| কঠিন অবস্থায় বিদ্যুৎ অপরিবাহী, গলিত বা দ্রবীভূত অবস্থায় পরিবাহী (conductor) | কঠিনে আয়ন আটকে থাকে; গলালে বা দ্রবীভূত করলে আয়ন চলাচল করে |
| অনেকেই পানিতে দ্রবণীয় (soluble), কেরোসিন-বেনজিনে নয় | পোলার (polar) পানির অণু আয়নকে ঘিরে ধরে (hydration) — তবে সবাই নয়: AgCl, BaSO₄, CaCO₃ পানিতে প্রায় অদ্রবণীয় |
নিচে নিজে দুটি ধর্ম পরীক্ষা করো:
লবণের কেলাসে Na⁺ আর Cl⁻ পর্যায়ক্রমে সাজানো। হাতুড়ি দিয়ে উপরের স্তরে আঘাত করে দেখো কী হয়।
কঠিন NaCl-এ আয়ন আছে, তবু কঠিন লবণ বিদ্যুৎ পরিবহন করে না কেন?
ধাপ ৪: সমযোজী বন্ধন — ইলেকট্রন শেয়ার
দুটি অধাতু পরমাণু (যেমন H আর H, বা C আর H) দুজনেই ইলেকট্রন টানে, কেউ ছাড়তে চায় না — স্থানান্তরে শক্তির খরচ বিশাল। তাই তারা শেয়ার করে: প্রত্যেকে একটি করে ইলেকট্রন দিয়ে একটি ইলেকট্রন জোড় (electron pair) গড়ে, আর জোড়টি দুই নিউক্লিয়াসের মাঝখানে থেকে দুজনকেই টানে।
সমযোজী বন্ধন (covalent bond): দুটি পরমাণুর মধ্যে এক বা একাধিক ইলেকট্রন জোড় শেয়ারের মাধ্যমে গঠিত বন্ধন।
- একক বন্ধন (single bond): 1 জোড় শেয়ার, H–H, H–Cl, C–H।
- দ্বিবন্ধন (double bond): 2 জোড়, O=O, C=O, C=C।
- ত্রিবন্ধন (triple bond): 3 জোড়, N≡N, C≡C, C≡N।
বন্ধন জোড় (bond pair): যে ইলেকট্রন জোড় দুটি পরমাণুর মধ্যে শেয়ার হয়। নিঃসঙ্গ জোড় (lone pair): যে জোড় শুধু একটি পরমাণুর, বন্ধনে অংশ নেয় না।
লুইস গঠন আঁকার নিয়ম: (১) সব পরমাণুর যোজ্যতা ইলেকট্রন (valence electrons) যোগ করো; (২) পরমাণুগুলো একক বন্ধনে জোড়ো; (৩) বাকি ইলেকট্রন নিঃসঙ্গ জোড় হিসেবে বসাও; (৪) কারও অষ্টক অপূর্ণ থাকলে নিঃসঙ্গ জোড় সরিয়ে দ্বি- বা ত্রিবন্ধন বানাও। মোট ইলেকট্রন সংখ্যা কখনো বদলায় না। নিচে নিজে চারটি অণু বানাও:
পরমাণুর মাঝখানে চাপ দিলে বন্ধন জোড় বাড়ে (একক → দ্বি → ত্রি-বন্ধন), পরমাণুর চারপাশের দাগের বৃত্তে চাপ দিলে নিঃসঙ্গ জোড় বসে।
পরমাণুর নিচের সংখ্যা: তার চারপাশের ইলেকট্রন / দরকারি সংখ্যা (H-এর 2, বাকিদের 8)। সবুজ = পূর্ণ।
N₂ অণুতে মোট 10টি যোজ্যতা ইলেকট্রন। দুই N-এর অষ্টক পূর্ণ করতে কী লাগে?
ধাপ ৫: যোজনী বন্ধন তত্ত্ব — অরবিটালের অধিক্রমণ
লুইস গঠন বলে কয়টি জোড় শেয়ার হয়, কিন্তু কীভাবে তা বলে না। আগের অধ্যায়ে দেখেছ, ইলেকট্রন থাকে অরবিটালে (orbital): s অরবিটাল গোলকাকার (spherical), p অরবিটাল দুই লোবের (lobe) ডাম্বেলের মতো, একটি লোব + দশা (phase), অন্যটি − দশা, আর তিনটি p অরবিটাল (, , ) পরস্পর লম্ব।
যোজনী বন্ধন তত্ত্ব (valence bond theory):
- দুটি পরমাণুর একটি করে অর্ধপূর্ণ (half-filled) যোজ্যতা অরবিটাল, যাদের ইলেকট্রনের স্পিন বিপরীত (opposite spin), পরস্পরকে আংশিক ঢেকে দেয় — একে বলে অধিক্রমণ (overlap)।
- অধিক্রমণের জায়গায় দুই নিউক্লিয়াসের মাঝে ইলেকট্রন ঘনত্ব (electron density) বাড়ে, দুই নিউক্লিয়াসই সেই জোড়কে টানে — বন্ধন হয়।
- অধিক্রমণ যত বেশি, বন্ধন তত শক্তিশালী।
- অরবিটালের নির্দিষ্ট দিক (direction) আছে, তাই সমযোজী বন্ধন দিকনির্দিষ্ট (directional) — অণুর নির্দিষ্ট আকৃতি (shape) ও বন্ধন কোণ (bond angle) থাকে। আয়নিক বন্ধন এর বিপরীত, অদিক।
ধাপ ৬: সিগমা (σ) ও পাই (π) বন্ধন
অধিক্রমণ দুভাবে হতে পারে:
- সিগমা (σ) বন্ধন: দুটি অরবিটাল দুই নিউক্লিয়াস সংযোগকারী রেখা, অর্থাৎ বন্ধন অক্ষ (bond axis) বরাবর মুখোমুখি (head-on) অধিক্রমণ করে। s–s (H₂), s–p (HCl), p–p (Cl₂), আর সংকর অরবিটাল (hybrid orbital) — সবাই σ বন্ধন দিতে পারে। ইলেকট্রন মেঘ অক্ষের উপর, অক্ষের চারপাশে প্রতিসম (cylindrically symmetric) — তাই একটি পরমাণুকে অক্ষের চারপাশে ঘোরালে অধিক্রমণ বদলায় না: মুক্ত ঘূর্ণন (free rotation) সম্ভব।
- পাই (π) বন্ধন: একটি σ বন্ধন হয়ে যাওয়ার পর দুই পরমাণুর দুটি সমান্তরাল (parallel) অর্ধপূর্ণ p অরবিটাল পাশাপাশি (side-on) অধিক্রমণ করে। ইলেকট্রন মেঘ অক্ষের উপরে ও নিচে দুই ভাগে, অক্ষের উপর ইলেকট্রন ঘনত্ব শূন্য। অধিক্রমণ কম, তাই π বন্ধন σ-এর চেয়ে দুর্বল। ঘোরালে p অরবিটাল আর সমান্তরাল থাকে না, π বন্ধন ভেঙে যায় — তাই দ্বিবন্ধনের চারপাশে ঘূর্ণন হয় না।
নিচে নিজে অরবিটাল জুড়ে দেখো। সব কয়টি জোড়া খুঁজে বের করো, তারপর π বন্ধনটি ঘুরিয়ে দেখো:
অরবিটাল দুটি এখনো দূরে — অধিক্রমণ (overlap) নেই। ডান পরমাণুটি টেনে বা নিচের স্লাইডারে কাছে আনো।
ছবিটি গুণগত (qualitative): অধিক্রমণের মিটার শুধু বেশি-কম বোঝায়, মাপা মান নয়।
s অরবিটাল কেন π বন্ধন গড়তে পারে না? s অরবিটাল গোলকাকার — যেকোনো অক্ষের চারপাশে প্রতিসম। তাই এটি যেকোনো দিক থেকে মিললেই অধিক্রমণ অক্ষ বরাবর হয় (σ), আর লম্ব p অরবিটালের সাথে মিললে + ও − লোবের সাথে সমান অধিক্রমণে নিট অধিক্রমণ শূন্য হয়ে যায়। সংকর অরবিটাল (hybrid orbital) বন্ধন অক্ষ বরাবর মুখ করে থাকে, পরস্পর সমান্তরাল হয় না — তাই তারাও শুধু σ বন্ধন দেয়; π বন্ধন হয় শুধু বিশুদ্ধ (unhybridised) p অরবিটাল দিয়ে (পরের পাঠে সংকরণ, hybridisation)।
σ আর π গোনা
দুটি পরমাণুর মধ্যে প্রথম বন্ধনটি সবসময় σ; বাকিগুলো π। দুই পরমাণুর মধ্যে সর্বোচ্চ 1টি σ ও 2টি π থাকতে পারে, কারণ বন্ধন অক্ষের সাথে লম্ব p অরবিটাল মাত্র দুটি।
| বন্ধন | σ | π |
|---|---|---|
| একক (single) | 1 | 0 |
| দ্বিবন্ধন (double) | 1 | 1 |
| ত্রিবন্ধন (triple) | 1 | 2 |
HCN (H–C≡N) অণুতে কয়টি σ ও কয়টি π বন্ধন আছে?
ধাপ ৭: বন্ধন দৈর্ঘ্য ও বন্ধনশক্তি
বন্ধন দৈর্ঘ্য (bond length): বন্ধনে যুক্ত দুই নিউক্লিয়াসের মধ্যকার গড় দূরত্ব। বন্ধনশক্তি (bond energy): গ্যাসীয় অবস্থায় 1 mol বন্ধন ভাঙতে প্রয়োজনীয় শক্তি। একই দুটি পরমাণুর মধ্যে বন্ধন ক্রম (bond order) বাড়লে বন্ধন খাটো ও শক্ত হয়:
| বন্ধন | উদাহরণ | গঠন | দৈর্ঘ্য (pm) | বন্ধনশক্তি (kJ/mol) |
|---|---|---|---|---|
| C–C | ইথেন (ethane) | 1σ | 154 | 347 |
| C=C | ইথিন (ethene) | 1σ + 1π | 134 | 614 |
| C≡C | ইথাইন (ethyne) | 1σ + 2π | 120 | 839 |
দ্বিবন্ধন কিন্তু একক বন্ধনের দ্বিগুণ শক্ত নয় ()। দ্বিতীয় বন্ধনটি π, যা যোগ করে মাত্র kJ/mol — σ-এর 347-এর চেয়ে কম। এটিই সংখ্যায় প্রমাণ যে π বন্ধন σ-এর চেয়ে দুর্বল। (এজন্যই ইথিনের মতো অসম্পৃক্ত যৌগ, unsaturated compound, সহজে যুত বিক্রিয়া, addition reaction, দেয়: দুর্বল π বন্ধনটি ভাঙে, σ থেকে যায়।)
নিচের কোনটি সঠিক?
ধাপ ৮: এবার নিজে করে দেখো
সিমুলেশনে তিনটি অংশ:
- আয়নিক (ionic): একটি ধাতু (Na, Mg, Ca, Al) আর একটি অধাতু (Cl, F, O) বেছে নাও, ধাতু কয়টি ইলেকট্রন দেবে তা-ও ঠিক করো। সংকেত নিজে থেকে মিলবে, আর শক্তির সিঁড়ি দেখাবে: আয়ন বানানোর খরচ, জালক শক্তির লাভ, আর মোট হিসাব প্রতি মোল ধাতুতে। কাল্পনিক আয়ন (যেমন Mg⁺, Na²⁺) দিয়েও চেষ্টা করো।
- সমযোজী σ/π (covalent): একটি অণু বেছে নাও, প্রতিটি বন্ধনে চাপ দিয়ে σ, σ + π বা σ + 2π চিহ্নিত করো, তারপর যাচাই করো।
- বন্ধনশক্তি (bond energy): তিনটি কার্বন–কার্বন বন্ধন শক্তি অনুযায়ী সাজাও।
চ্যালেঞ্জগুলো একে একে শেষ করো, আর প্রতিটি ফল পর্যবেক্ষণ খাতায় (observation notebook) লেখো।
বন্ধন নির্মাতা
Bond builder: ionic energetics & σ/π bonds- আয়নীকরণ (ΣIE × 1)
- +496
- অ্যানায়ন তৈরি (× 1)
- −349
- জালক শক্তি (lattice)
- −787 (CRC)
- প্রতি মোল ধাতু (per mol metal)
- −640
✓ NaCl: প্রতি মোল Na-এ সবচেয়ে বেশি শক্তি বের হয় — এটিই বাস্তবে তৈরি হয়।
দণ্ড লগারিদমিক স্কেলে (log scale)।
IE: NIST; EA: Hotop–Lineberger; জালক শক্তি: CRC Handbook। কাল্পনিক যৌগের জালক শক্তি কাপুস্টিনস্কি সমীকরণ (Kapustinskii equation) দিয়ে অনুমান — একই আধানের বাস্তব আয়নের ব্যাসার্ধ ধরে। O²⁻ তৈরির শক্তি (দ্বিতীয় EA) সরাসরি মাপা যায় না, তাই আনুমানিক (≈)। শক্তি গ্যাসীয় পরমাণু থেকে কঠিন যৌগ পর্যন্ত।
চ্যালেঞ্জ (challenges)
0/6- C₂H₂-এর প্রতিটি বন্ধনকে σ/π হিসেবে চিহ্নিত করো — মোট কয়টি σ, কয়টি π?
- Mg আর O দিয়ে MgO বানাও, তারপর Mg⁺ (বা Mg³⁺) দিয়ে চেষ্টা করে তুলনা করো
- এমন একটি অণু চিহ্নিত করো যাতে π বন্ধন আছে কিন্তু কোনো দ্বিবন্ধন (double bond) নেই
- Na²⁺ দিয়ে NaCl₂ বানানোর চেষ্টা করো — কী হয়?
- C–C, C=C, C≡C-কে বন্ধনশক্তি অনুযায়ী দুর্বল থেকে শক্তিশালী সাজাও
- অন্তত ৪টি বাস্তব আয়নিক যৌগ বানাও; 1:1 (AB ধরনের) যৌগের মধ্যে কোনটির জালক শক্তি সবচেয়ে বেশি? (1/4, MgO সহ)
পর্যবেক্ষণ খাতা (observation notebook)
এখনো কিছু নেই। একটি অণুর σ/π যাচাই করো বা একটি আয়নিক যৌগ খাতায় লেখো।
বই পড়ার সময় সাবধান
- বই আয়নিক বন্ধনের শক্তির কারণ বলে না — শুধু “নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো স্থায়ী বিন্যাস” বলে। আসলে ইলেকট্রন স্থানান্তর সবসময় শক্তি খরচ করে (IE − EA > 0, Na + Cl-এ +147 kJ/mol); আয়নিক যৌগ তৈরি হয় জালক শক্তির (NaCl-এ 787 kJ/mol) কারণে।
- “আয়নিক যৌগ পানিতে দ্রবীভূত হয়” (বইয়ের পৃ. ৩১৭) — সব নয়। AgCl, BaSO₄, CaCO₃ আয়নিক হয়েও পানিতে প্রায় অদ্রবণীয়; দ্রাব্যতা নির্ভর করে জালক শক্তি আর আয়নের পানিযোজন শক্তির (hydration energy) টানাটানির উপর।
- “বিশুদ্ধ সমযোজী যৌগ পানিতে অদ্রবণীয়” (পৃ. ৩১৭) — ভুল সাধারণীকরণ। চিনি, গ্লুকোজ, ইথানল, অ্যামোনিয়া, HCl সমযোজী, কিন্তু পানিতে খুব দ্রবণীয় (পোলারিটি ও হাইড্রোজেন বন্ধনের কারণে, পাঠ ১২–১৩)।
- “ধাতু + অধাতু → আয়নিক” একটি মোটা দাগের নিয়ম। AlCl₃ ধাতু-অধাতু হয়েও অনেকটা সমযোজী (180 °C-এ ঊর্ধ্বপাতিত হয়), আবার NH₄Cl-এ কোনো ধাতু নেই, তবু এটি আয়নিক।
- “100% সমযোজী যৌগ নেই” (পৃ. ৩৪০) — কথাটি দুটি ভিন্ন মৌলের যৌগের জন্য সত্য। কিন্তু H₂, Cl₂, N₂-এর মতো একই মৌলের অণুর বন্ধন 100% সমযোজী (তড়িৎ ঋণাত্মকতার পার্থক্য শূন্য)।
- অক্ষের নাম: বইয়ের σ বন্ধনের ছবিতে বন্ধন অক্ষ x, কিন্তু O₂-এর বর্ণনায় দিয়ে σ আর দিয়ে π। দুটিই চলে — কোন অক্ষকে বন্ধন অক্ষ ধরবে তা তোমার পছন্দ। আসল কথা: অক্ষ বরাবর মুখোমুখি = σ, অক্ষের লম্ব সমান্তরাল p = π।
- O₂ = 1σ + 1π পরীক্ষার জন্য ঠিক উত্তর। তবে মনে রাখো, বাস্তবে O₂ চুম্বকে আকৃষ্ট হয় (paramagnetic), অর্থাৎ এতে দুটি অযুগ্ম ইলেকট্রন (unpaired electrons) আছে — লুইস বা যোজনী বন্ধন তত্ত্ব তা ব্যাখ্যা করতে পারে না, আণবিক অরবিটাল তত্ত্ব (molecular orbital theory) পারে।
- সারসংক্ষেপে (পৃ. ৩৬৩) “ভ্যান ডার ওয়ালস বলের উদাহরণ আয়ন-ডাইপোল আকর্ষণ, হাইড্রোজেন বন্ধন” — IUPAC-এর সংজ্ঞায় ভ্যান ডার ওয়ালস বল (van der Waals forces) আয়নের আকর্ষণকে ধরে না; পাঠ ১৩-এ বিস্তারিত।
ঘরে বসে পরীক্ষা: লবণ পানি বনাম চিনির পানি
একটি সহজ পরিবাহিতা পরীক্ষক (conductivity tester) বানাও:
- লাগবে: একটি 9 V ব্যাটারি, একটি LED আর তার সাথে একটি 470 Ω রোধক (resistor) — অথবা শুধু একটি ছোট 9 V বাজার (buzzer), তিন টুকরা তার, আর দুটি পরিষ্কার পেরেক বা পেন্সিলের শিস (graphite) তড়িৎদ্বার (electrode) হিসেবে।
- ব্যাটারি → LED (রোধসহ) → একটি তড়িৎদ্বার; অন্য তড়িৎদ্বার → ব্যাটারির অন্য প্রান্ত। দুই তড়িৎদ্বার একসাথে ছোঁয়ালে LED জ্বলবে — সার্কিট ঠিক আছে।
- তিনটি কাপে নাও: (ক) শুকনো লবণের দানা, (খ) পরিষ্কার পানিতে (সম্ভব হলে বোতলের পানি) দুই চামচ চিনি, (গ) একই পানিতে দুই চামচ লবণ।
- প্রতিটিতে তড়িৎদ্বার দুটি 1 cm দূরে ডুবিয়ে দেখো। কোনটিতে LED জ্বলে? শুধু পানিতে কী হয়?
- খাতায় লেখো এবং ধাপ ৩ দিয়ে ব্যাখ্যা করো: কোথায় চলমান আয়ন আছে, কোথায় নেই।
নিরাপত্তা: শুধু 9 V ব্যাটারি ব্যবহার করবে — কখনো বাসার বিদ্যুৎ লাইন (mains) নয়। লবণ পানিতে তড়িৎদ্বারে সামান্য ক্লোরিন গ্যাস তৈরি হতে পারে, তাই কয়েক সেকেন্ডের বেশি চালু রাখবে না, খোলা জায়গায় করবে, আর দ্রবণ মুখে দেবে না। শেষে হাত ধুয়ে নাও।
পরীক্ষার প্রস্তুতি
১. আয়নিক বন্ধন ও সমযোজী বন্ধনের সংজ্ঞা দাও, উদাহরণসহ। CaF₂ আর NH₃-এর মধ্যে কোনটিতে কোন বন্ধন?
আয়নিক বন্ধন: ধাতু থেকে অধাতুতে ইলেকট্রন স্থানান্তরে সৃষ্ট বিপরীত আধানের আয়নের মধ্যকার তড়িৎ আকর্ষণ — যেমন NaCl, MgO। সমযোজী বন্ধন: দুটি পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন জোড় শেয়ারে গঠিত বন্ধন — যেমন H₂, CH₄।
CaF₂: Ca (ধাতু, গ্রুপ 2) দুটি ইলেকট্রন দুটি F-কে দেয় → Ca²⁺ ও 2F⁻, আয়নিক। NH₃: N ও H দুটিই অধাতু, তিনটি N–H ইলেকট্রন জোড় শেয়ার করে, সমযোজী (3 বন্ধন জোড় + 1 নিঃসঙ্গ জোড়)।
২. নিচের অণুতে কয়টি σ ও কয়টি π বন্ধন আছে? (ক) CO₂ (খ) HCHO (গ) CH₂=CH–C≡N
নিয়ম: প্রতিটি বন্ধিত পরমাণু-জোড়ে 1σ; দ্বিবন্ধনে বাড়তি 1π, ত্রিবন্ধনে বাড়তি 2π।
- (ক) O=C=O: 2σ + 2π।
- (খ) HCHO: দুটি C–H (2σ) + C=O (1σ + 1π) = 3σ + 1π।
- (গ) CH₂=CH–C≡N: তিনটি C–H (3σ), C=C (1σ + 1π), C–C (1σ), C≡N (1σ + 2π) = 6σ + 3π।
৩. সিগমা বন্ধন অপেক্ষা পাই বন্ধন দুর্বল কেন? সংখ্যা দিয়ে দেখাও।
σ বন্ধনে অরবিটাল অক্ষ বরাবর মুখোমুখি অধিক্রমণ করে — অধিক্রমণ বেশি, ইলেকট্রন ঘনত্ব ঠিক দুই নিউক্লিয়াসের মাঝে। π বন্ধনে সমান্তরাল p অরবিটাল পাশাপাশি অধিক্রমণ করে — অধিক্রমণ কম, ইলেকট্রন মেঘ অক্ষের উপরে-নিচে, নিউক্লিয়াস থেকে দূরে। অধিক্রমণ কম মানে বন্ধন দুর্বল।
সংখ্যায়: C–C (শুধু σ) 347 kJ/mol, C=C (σ + π) 614 kJ/mol। তাই π অংশের শক্তি ≈ 614 − 347 = 267 kJ/mol, যা σ-এর চেয়ে কম।
৪. পাই বন্ধন গঠনে s অরবিটাল বা সংকর অরবিটাল অংশ নেয় না কেন?
π বন্ধনের দুটি শর্ত: (i) দুই পরমাণুর মধ্যে আগে একটি σ বন্ধন থাকতে হবে, (ii) দুই পরমাণুতে বন্ধন অক্ষের লম্ব, পরস্পর সমান্তরাল দুটি অর্ধপূর্ণ অরবিটালের পাশাপাশি অধিক্রমণ হতে হবে।
s অরবিটাল গোলকাকার, অদিক (non-directional) — এর কোনো “পাশ” নেই; যেভাবেই মিলুক অধিক্রমণ অক্ষ বরাবর হয় (σ)। আর লম্ব p অরবিটালের সাথে মিললে + ও − লোবে সমান অধিক্রমণে নিট শূন্য। সংকর অরবিটালগুলো বন্ধন অক্ষ বরাবর মুখ করে থাকে এবং পরস্পর নির্দিষ্ট কোণে (sp³-এ 109.5°) থাকে, সমান্তরাল হয় না — তাই এরা শুধু σ বন্ধন দেয়। π বন্ধন হয় বিশুদ্ধ p (বা d) অরবিটাল দিয়ে।
৫. “সমযোজী বন্ধন দিকনির্দিষ্ট, কিন্তু আয়নিক বন্ধন অদিক” — ব্যাখ্যা করো।
সমযোজী বন্ধন হয় নির্দিষ্ট অরবিটালের অধিক্রমণে, আর p ও সংকর অরবিটালের নির্দিষ্ট দিক আছে। অধিক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয় ওই দিক বরাবর, তাই বন্ধনগুলো নির্দিষ্ট দিকে, নির্দিষ্ট কোণে থাকে — এজন্য H₂O বাঁকা (104.5°), CH₄ চতুস্তলকীয় (109.5°)।
আয়নিক বন্ধন আয়নের তড়িৎ আকর্ষণ, যা গোলকীয় আধানের চারপাশে সব দিকে সমান। তাই প্রতিটি আয়ন যত বেশি সম্ভব বিপরীত আয়ন দিয়ে সব দিক থেকে ঘেরা থাকে (NaCl-এ 6টি) — কোনো নির্দিষ্ট দিক নেই, আলাদা অণুও নেই।
৬. (গাণিতিক) KCl-এর জন্য: ΔfH° = −436.5, K-এর ঊর্ধ্বপাতন তাপ +89.0, IE₁(K) = +418.8, ½D(Cl₂) = +121.3, EA(Cl) = 348.6 (নির্গত) kJ/mol। বর্ন-হেবার চক্র দিয়ে KCl-এর জালক শক্তি বের করো।
হেসের সূত্র (Hess’s law) অনুযায়ী সরাসরি পথ = ধাপে ধাপে পথ:
CRC Handbook-এর মান 717 kJ/mol — মিলে গেছে। NaCl-এর (787) চেয়ে কম, কারণ K⁺ (138 pm) Na⁺-এর (102 pm) চেয়ে বড়, আয়নগুলো দূরে থাকে।
৭. গলিত NaCl বিদ্যুৎ পরিবহন করে, কিন্তু গলিত চিনি করে না কেন?
বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য চলমান আধান লাগে। NaCl আয়নিক — গলালে জালক ভেঙে Na⁺ ও Cl⁻ মুক্তভাবে চলাচল করে, ক্যাথোড ও অ্যানোডের দিকে যায়, তাই বিদ্যুৎ চলে। চিনি (সুক্রোজ, C₁₂H₂₂O₁₁) সমযোজী অণু দিয়ে গঠিত — গলালেও শুধু নিরপেক্ষ অণু থাকে, কোনো আয়ন থাকে না, তাই বিদ্যুৎ চলে না।