পাঠ ১৯ / ২০অনুচ্ছেদ ২.২০–২.২০.২

প্রাকৃতিক পলিমার: গ্লাইকোসাইড ও পেপটাইড বন্ধনNatural polymers — glycoside & peptide bonds

ভাত-আলুর স্টার্চ (starch) আর তুলার সেলুলোজ (cellulose) — দুটিই সাদা গুঁড়া বা আঁশ, আর দুটিই শুধু গ্লুকোজ (glucose) দিয়ে গাঁথা শিকল। নিচে নিজে দেখো: একটি বেছে নাও, দুটি গ্লুকোজের মধ্যের বন্ধন α থেকে β করো, তারপর লালার এনজাইম অ্যামাইলেজ (amylase) দিয়ে দুটিকেই ভাঙার চেষ্টা করো।

গ্লাইকোসাইড বন্ধন (glycosidic bond):

দুটি গ্লুকোজ (two glucose units)

লম্বা শিকল: অ্যামাইলোজ (amylose)

α-গ্লুকোজ বলয় (ring)β-গ্লুকোজ বলয়বলয়ের OCH₂OHঘোরাতে টেনে দেখো (drag to turn)

স্টার্চে প্রতিটি গ্লুকোজ একই দিকে মুখ করে α-1,4 বন্ধনে যুক্ত — একটু একটু বাঁকতে বাঁকতে শিকলটি প্যাঁচানো কুণ্ডলী (helix) হয়ে যায়।

একই গ্লুকোজ, তবু একটি আমাদের খাবার আর অন্যটি কাপড়-কাগজ — কেন? আর প্রোটিন (protein) কীভাবে একই নিয়মে অন্য ধরনের একক জুড়ে তৈরি হয়? এই পাঠে ধাপে ধাপে:

  1. গ্লুকোজের গঠন: কাইরাল কেন্দ্র (chiral centre), বলয় গঠন, α ও β রূপ
  2. গ্লাইকোসাইড বন্ধন (glycosidic bond): মল্টোজ, সেলোবায়োজ, সুক্রোজ; স্টার্চ, গ্লাইকোজেন ও সেলুলোজ
  3. অ্যামাইনো এসিড (amino acid) ও জুইটার আয়ন (zwitterion)
  4. পেপটাইড বন্ধন (peptide bond)
  5. প্রোটিনের চার স্তরের গঠন ও স্বভাবচ্যুতি (denaturation)
  6. প্রাকৃতিক বনাম কৃত্রিম ঘনীভবন পলিমার (condensation polymer)
  7. এবার নিজে করে দেখো — 3D সিমুলেশন

আগে আলোক সমাণুতা ও কাইরালিটি, এস্টার ও অ্যামাইড আর পলিমার পাঠগুলো দেখে নিলে সুবিধা হবে।

ধাপ ১: গ্লুকোজ — শিকল থেকে বলয়

গ্লুকোজ C6H12O6\mathrm{C_6H_{12}O_6} একটি অ্যালডোহেক্সোজ (aldohexose): ছয় কার্বনের শিকল, C1-এ অ্যালডিহাইড (–CHO), বাকিগুলোতে –OH। ফিশার অভিক্ষেপে (Fischer projection) C2, C3, C4, C5 — চারটি কার্বনেই চারটি ভিন্ন মূলক, অর্থাৎ চারটি কাইরাল কেন্দ্র। তাই সম্ভাব্য স্টেরিও-সমাণু (stereoisomer):

2n=24=162^{n} = 2^{4} = 16

এর একটি D-গ্লুকোজ — সবচেয়ে নিচের কাইরাল কার্বনের (C5) –OH ডানে বলে “D”। (D/L হলো বিন্যাস (configuration); ঘূর্ণনের দিক (+)/(−) আলাদা জিনিস — পাঠ ৫ মনে করো।)

পানিতে গ্লুকোজ প্রায় পুরোটাই বলয় (ring) আকারে থাকে: C5-এর –OH-এর অক্সিজেন C1-এর C=O-কে আক্রমণ করে ছয় সদস্যের বলয় (পাইরানোজ, pyranose) বানায় — অ্যালডিহাইড + অ্যালকোহল বিক্রিয়ায় হেমিঅ্যাসিটাল (hemiacetal)। এতে C1 নতুন কাইরাল কেন্দ্র হয়, তাই দুটি রূপ:

পানিতে এরা বলয় খুলে-বন্ধ হয়ে একে অপরে বদলায় — মিউটারোটেশন (mutarotation) — শেষে [α]D=+52.7∘[\alpha]_D = +52.7^\circ, প্রায় 36 % α আর 64 % β। নিজে বলয় বন্ধ করো:

শিকল রূপ: ফিশার অভিক্ষেপ (Fischer projection)

CHOC1CHOHC2CHOHC3CHOHC4CHOHC5CH₂OHC6D-গ্লুকোজ: C5-এর OH ডানে → D (right)

শিকলকে বাঁকিয়ে রাখা হলো — C5-এর O কে C1-এ টেনে আনো

C1C2C3C4C5OHOHOHCH₂OHOHঅ্যালডিহাইড (CHO)OH

C5-এর –OH-এর অক্সিজেন (লাল বৃত্ত) টেনে C1-এর অ্যালডিহাইড কার্বনের কাছে (হলুদ দাগ) ছেড়ে দাও। এটি অণুর ভেতরে অ্যালডিহাইড + অ্যালকোহল বিক্রিয়া।

নিজে যাচাই করো

বলয় গঠনের পর গ্লুকোজে কয়টি কাইরাল কেন্দ্র, আর α ও β রূপ পরস্পর কী?

ধাপ ২: গ্লাইকোসাইড বন্ধন — শর্করা জোড়া লাগানো

একটি শর্করার অ্যানোমেরিক কার্বনের (anomeric carbon, গ্লুকোজের C1) –OH আর অন্য শর্করার একটি –OH থেকে এক অণু পানি বেরিয়ে যে C–O–C বন্ধন হয়, সেটি গ্লাইকোসাইড বন্ধন। এটি ঘনীভবন (condensation) বিক্রিয়া:

2 C6H12O6⟶C12H22O11+H2O\mathrm{2\,C_6H_{12}O_6 \longrightarrow C_{12}H_{22}O_{11} + H_2O}

বন্ধনের নাম লেখা হয় C1-এর রূপ (α বা β) আর যুক্ত কার্বন দুটি দিয়ে — যেমন α-1,4। নিচে দুটি শর্করা বেছে জুড়ে দেখো:

বামের শর্করা (C1 দেবে):
ডানের শর্করা:
ডানের কোন কার্বনের OH?
C1OHHC2OHC3OHC4OHC5CH₂OHOC1OHHC2OHC3OHC4OHC5CH₂OHOα-গ্লুকোজα-গ্লুকোজ+
ডাইস্যাকারাইড (disaccharide)এককবন্ধনবিজারক? (reducing)
মল্টোজ (maltose)গ্লুকোজ + গ্লুকোজα-1,4হ্যাঁ
সেলোবায়োজ (cellobiose)গ্লুকোজ + গ্লুকোজβ-1,4হ্যাঁ
সুক্রোজ (sucrose, চিনি)গ্লুকোজ + ফ্রুক্টোজ (fructose)α1↔2βনা

কোনো একটি অ্যানোমেরিক কার্বন মুক্ত থাকলে বলয় খুলে –CHO দিতে পারে, তাই সেই শর্করা ফেলিং (Fehling’s) ও টলেন্স (Tollens’) দ্রবণকে বিজারিত করে। সুক্রোজে দুটি অ্যানোমেরিক কার্বনই বন্ধনে আটকা — তাই অবিজারক।

একই বন্ধন হাজার বার পুনরাবৃত্ত হলে পলিস্যাকারাইড (polysaccharide):

পলিস্যাকারাইডবন্ধনআকারআয়োডিন (iodine)কোথায়
অ্যামাইলোজ (amylose)α-1,4কুণ্ডলী (helix), পাকে 6টি গ্লুকোজগাঢ় নীলস্টার্চের 20–30 %
অ্যামাইলোপেকটিন (amylopectin)α-1,4 + α-1,6 শাখা, প্রতি 24–30টিতেশাখাযুক্তলালচে বেগুনিস্টার্চের 70–80 %
গ্লাইকোজেন (glycogen)α-1,4 + α-1,6 শাখা, প্রতি 8–12টিতেআরও শাখাযুক্তলালচে বাদামিপ্রাণীর যকৃৎ ও পেশি
সেলুলোজ (cellulose)β-1,4সোজা শিকল, H-বন্ধনে পাতরং হয় নাউদ্ভিদের কোষপ্রাচীর; তুলা ≈ 90 %
অ্যামাইলোজ (amylose)α-1,4, শাখাহীন, প্যাঁচানো (helix)ভেতরে I₃⁻/I₅⁻ (বেগুনি) → নীলঅ্যামাইলোপেকটিনα-1,4 + α-1,6 শাখা, প্রতি 24–30টিতেকমলা = শাখা-বিন্দু (α-1,6 branch point)গ্লাইকোজেন (glycogen)আরও ঘন শাখা, প্রতি 8–12টিতেসেলুলোজ (cellulose)β-1,4, সোজা শিকল, H-বন্ধনে পাত (sheet)নীল দাগ = শিকলের মাঝের H-বন্ধন (H-bond)
চারটিই শুধু গ্লুকোজের পলিমার — পার্থক্য বন্ধনের ধরন (α না β), কোন কার্বনে জোড়া (1,4 না 1,6) আর শাখার পরিমাণে। ছবিটি প্রতীকী (schematic): আসল শিকলে শত শত থেকে হাজার হাজার গ্লুকোজ।

কেন স্টার্চ নীল হয়? আয়োডিন পানিতে কম দ্রবণীয়, তাই KI দ্রবণে দ্রবীভূত করা হয়: I2+I−→I3−\mathrm{I_2 + I^- \rightarrow I_3^-}। অ্যামাইলোজের কুণ্ডলীর ফাঁপা কেন্দ্রে I₃⁻/I₅⁻ আয়নের সারি ঢুকে বসে; এই জটিল যৌগ প্রায় 620 nm-এর (কমলা-লাল) আলো শোষণ করে, তাই আমরা গাঢ় নীল দেখি।

কেন সেলুলোজ হজম হয় না? এনজাইম তালা-চাবির মতো নির্দিষ্ট আকৃতির বন্ধন চেনে। আমাদের অ্যামাইলেজ α-1,4 বন্ধন কাটে, কিন্তু β-1,4 কাটার এনজাইম সেলুলেজ (cellulase) মানুষের নেই। গরু-ছাগলের পেটের অণুজীব সেলুলেজ বানায়, তাই তারা ঘাস হজম করে। আমাদের কাছে সেলুলোজ খাদ্য-আঁশ (dietary fibre)।

নিজে যাচাই করো

একটি শর্করার দ্রবণ ফেলিং দ্রবণের রং বদলায় না, কিন্তু লঘু এসিডে আর্দ্র বিশ্লেষণের পর বদলায়। শর্করাটি কোনটি?

ধাপ ৩: অ্যামাইনো এসিড ও জুইটার আয়ন

প্রোটিনের একক α-অ্যামাইনো এসিড: একই কার্বনে (α-কার্বন) –NH₂, –COOH, –H আর একটি পার্শ্বশিকল R — সাধারণ সংকেত H2N−CHR−COOH\mathrm{H_2N{-}CHR{-}COOH}। প্রোটিনে 20 ধরনের R থাকে, যেমন:

অ্যামাইনো এসিডRধরন
গ্লাইসিন (glycine, Gly)–Hঅপোলার; একমাত্র অকাইরাল
অ্যালানিন (alanine, Ala)–CH₃অপোলার
সেরিন (serine, Ser)–CH₂OHপোলার
সিস্টেইন (cysteine, Cys)–CH₂SHদুটি মিলে S–S সেতু → সিস্টিন (cystine)
ফিনাইলঅ্যালানিন (Phe)–CH₂C₆H₅অ্যারোমেটিক
লাইসিন (lysine, Lys)–(CH₂)₄NH₂ক্ষারীয়
গ্লুটামিক এসিড (Glu)–(CH₂)₂COOHঅম্লীয়

গ্লাইসিন ছাড়া সবগুলোর α-কার্বন কাইরাল; প্রোটিনের অ্যামাইনো এসিড সবই L-বিন্যাসের।

একই অণুতে এসিড (–COOH) আর ক্ষারক (–NH₂) থাকায় অণুর ভেতরেই প্রোটন স্থানান্তর হয়: H3N+−CHR−COO−\mathrm{H_3N^+{-}CHR{-}COO^-} — দুই প্রান্তে বিপরীত চার্জ, মোট চার্জ শূন্য। একে জুইটার আয়ন (zwitterion) বলে। এজন্য অ্যামাইনো এসিড আয়নিক কেলাসের মতো উচ্চ গলনাঙ্কের (গ্লাইসিন প্রায় 233 °C-এ বিযোজিত হয়) আর পানিতে দ্রবণীয়। যে pH-এ মোট চার্জ শূন্য, সেটি সমবিভব বিন্দু (isoelectric point, pI)। pH বদলে নিজে দেখো:

গ্লাইসিন (glycine) — R = H, C₂H₅NO₂, M = 75.07 g mol⁻¹

CαHHH₃N⁺COO⁻প্রধান রূপ: জুইটার আয়ন (zwitterion)
pKa₁pKa₂pI 5.97

বিদ্যুৎক্ষেত্রে (electric field / electrophoresis)

−+

গড় নিট চার্জ (net charge) = −0.00 — pI-তে কোনো দিকে যায় না।

নিজে যাচাই করো

pH 1-এ গ্লাইসিনের প্রধান রূপ কোনটি?

ধাপ ৪: পেপটাইড বন্ধন

একটি অ্যামাইনো এসিডের –COOH আর পরেরটির –NH₂ থেকে এক অণু পানি বেরিয়ে যে অ্যামাইড বন্ধন –CO–NH– হয়, প্রোটিনে তার নাম পেপটাইড বন্ধন। দুটি অ্যামাইনো এসিডে ডাইপেপটাইড (dipeptide), তিনটিতে ট্রাইপেপটাইড, অনেকগুলোতে পলিপেপটাইড (polypeptide)।

গ্লাইসিন (glycine)H₂N–CH₂–C–O‖OH+H–N–CH–COOHHCH₃অ্যালানিন (alanine)− H₂Oঘনীভবন(condensation)H₂N–CH₂–C–NO‖H–CH–COOHCH₃+ H₂Oগ্লাইসিল-অ্যালানিন (Gly–Ala), একটি ডাইপেপটাইড (dipeptide); কমলা ঘর = পেপটাইড বন্ধন (–CO–NH–)অনুরণন (resonance):O=C–N–H ⟷ ⁻O–C=N⁺–HC–N: 133 pm(একক C–N ≈ 147, C=N ≈ 127 pm)
একটি অ্যামাইনো এসিডের –COOH থেকে OH আর পরেরটির –NH₂ থেকে H মিলে এক অণু পানি বেরিয়ে যায়, তৈরি হয় অ্যামাইড বন্ধন –CO–NH–, যাকে প্রোটিনে বলে পেপটাইড বন্ধন। N-এর নিঃসঙ্গ জোড় C=O-এর সঙ্গে অনুরণনে থাকে, তাই C–N বন্ধন অর্ধেক দ্বিবন্ধনের মতো (133 pm): এটি ঘুরতে পারে না, আর O, C, N, H একই সমতলে (planar) থাকে।

মনে রাখার দুটি নিয়ম:

উদাহরণ: মানুষের ইনসুলিনে (insulin) 51টি অ্যামাইনো এসিড, কিন্তু দুটি শিকলে — A শিকলে 21টি, B শিকলে 30টি। তাই পেপটাইড বন্ধন (21−1)+(30−1)=49(21-1)+(30-1) = 49টি, আর তিনটি S–S সেতু (দুটি শিকলের মাঝে, একটি A শিকলের ভেতরে)। শিকল জুড়ে নিজে গোনো:

pH:
H₃N⁺COO⁻Gly1CO–NHAla2
H₃N⁺–CH₂–CO–NH–CH(CH₃)–COO⁻
অ্যামাইনো এসিড (n)2
পেপটাইড বন্ধন1 = 2 − 1
বেরিয়ে যাওয়া H₂O1
মোলার ভর (M)146.15

গ্লাইসিল-অ্যালানিন (Gly–Ala): গ্লাইসিনের –COOH আর অ্যালানিনের –NH₂ থেকে এক অণু H₂O বেরিয়ে –CO–NH– বন্ধন। এবার “উল্টো ক্রম” চেপে Ala–Gly বানাও।

নিজে যাচাই করো

গ্লাইসিন, অ্যালানিন ও সেরিন — প্রতিটি একবার নিয়ে কয়টি ভিন্ন ট্রাইপেপটাইড বানানো যায়, আর প্রতিটিতে কয়টি পেপটাইড বন্ধন?

ধাপ ৫: প্রোটিনের গঠন ও স্বভাবচ্যুতি

পলিপেপটাইড শিকল শুধু সোজা সুতার মতো পড়ে থাকে না — চার স্তরে সাজে:

1° প্রাইমারি (primary)অ্যামাইনো এসিডের ক্রমGlyIleValGluGlnCysCysইনসুলিনের A শিকলের শুরু2° সেকেন্ডারিα-হেলিক্স (α-helix)β-শিট (β-pleated sheet)3° টারশিয়ারি (tertiary)S–S+ / − লবণ সেতুপুরো শিকলের ত্রিমাত্রিক ভাঁজ — মায়োগ্লোবিন4° কোয়াটারনারিαββαহিমোগ্লোবিন: 4টি শিকল (α₂β₂)
1° — শুধু পেপটাইড বন্ধনে গাঁথা ক্রম। 2° — মূল শিকলের N–H আর C=O-এর মধ্যে H-বন্ধন (নীল দাগ)। 3° — পার্শ্বশিকলগুলোর H-বন্ধন, আয়নিক আকর্ষণ, S–S সেতু আর হাইড্রোফোবিক টানে পুরো শিকলের ভাঁজ। 4° — একাধিক শিকল জুড়ে একটি প্রোটিন।
স্তরকী ধরে রাখেউদাহরণ
1° প্রাইমারি (primary)পেপটাইড বন্ধন — অ্যামাইনো এসিডের ক্রমইনসুলিনের A ও B শিকল
2° সেকেন্ডারি (secondary)মূল শিকলের N–H···O=C হাইড্রোজেন বন্ধনα-হেলিক্স (প্রতি পাকে 3.6টি একক, i → i+4 H-বন্ধন), β-শিট
3° টারশিয়ারি (tertiary)পার্শ্বশিকলের H-বন্ধন, আয়নিক আকর্ষণ, S–S সেতু, হাইড্রোফোবিক টানমায়োগ্লোবিন (myoglobin, পেশিতে O₂ জমা রাখে), এনজাইম, অ্যালবুমিন
4° কোয়াটারনারি (quaternary)একাধিক শিকলের মধ্যে একই ধরনের আকর্ষণহিমোগ্লোবিন (haemoglobin): 4টি শিকল, α₂β₂

তাপ, এসিড-ক্ষার, অ্যালকোহল বা ভারী ধাতুর আয়নে দুর্বল বন্ধনগুলো ভেঙে যায়, প্রোটিন তার 2°, 3° ও 4° গঠন হারায় — একে স্বভাবচ্যুতি (denaturation) বলে। পেপটাইড বন্ধন সমযোজী, তাই 1° গঠন (ক্রম) অক্ষত থাকে। ডিম সেদ্ধ করলে সাদা অংশ অস্বচ্ছ ও শক্ত হয়, দুধে লেবুর রস দিলে ছানা কেটে যায় — দুটোই স্বভাবচ্যুতি। স্বভাবচ্যুত প্রোটিন সাধারণত কাজ হারায় (এনজাইম আর কাজ করে না)।

নিজে যাচাই করো

ডিম সেদ্ধ করলে ডিমের সাদা অংশের প্রোটিনে কোন বন্ধন ভাঙে না?

ধাপ ৬: প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ঘনীভবন পলিমার

পাঠ ১৮-তে নাইলন-6,6 দেখেছ। প্রোটিনের পেপটাইড বন্ধন আর নাইলনের অ্যামাইড বন্ধন আসলে একই –CO–NH–; শর্করার শিকলে সংযোগটি C–O–C। তিনটিই ঘনীভবন পলিমার — প্রতিটি বন্ধনে এক অণু পানি বেরোয়।

প্রোটিন (protein) — অ্যামাইনো এসিড থেকে, প্রাকৃতিক…–NH–CHR–CO–NH–CHR′–CO–NH–CHR″–…নাইলন-6,6 (nylon-6,6) — হেক্সামিথিলিন ডাইঅ্যামিন + অ্যাডিপিক এসিড, কৃত্রিম–[NH–(CH₂)₆–NH–CO–(CH₂)₄–CO]ₙ–স্টার্চ / সেলুলোজ — গ্লুকোজ থেকে; সংযোগ C–O–C (গ্লাইকোসাইড বন্ধন)…–Glc–C1–O–C4–Glc–C1–O–C4–Glc–…
হলুদ: একই অ্যামাইড বন্ধন –CO–NH–। প্রোটিন আর নাইলন দুটিই পলিঅ্যামাইড (polyamide), দুটিই ঘনীভবন পলিমারকরণে (condensation polymerisation) পানি ছেড়ে তৈরি। নীল: শর্করার শিকলে সংযোগ C–O–C (অ্যাসিটাল, acetal) বন্ধন — এটিও পানি ছেড়ে তৈরি।
পলিস্যাকারাইডপ্রোটিননাইলন-6,6
মনোমারগ্লুকোজ (একই একক)২০ ধরনের অ্যামাইনো এসিডডাইঅ্যামিন + ডাইকার্বক্সিলিক এসিড
সংযোগ বন্ধনগ্লাইকোসাইড (C–O–C)পেপটাইড (–CO–NH–)অ্যামাইড (–CO–NH–)
উপজাতH₂OH₂OH₂O
উৎসউদ্ভিদ/প্রাণীসব জীবকারখানা
এনজাইমে ভাঙে?হ্যাঁ (α); সেলুলোজ শুধু সেলুলেজেহ্যাঁ (প্রোটিয়েজ)খুব ধীরে — জৈব-অবিয়োজ্য

ধাপ ৭: এবার নিজে করে দেখো

তিনটি ট্যাবে কাজ:

3D মডেলটি প্রতীকী (schematic): বলয়গুলো সমতল ষড়ভুজ, প্রোটিনে প্রতিটি বল একটি অ্যামাইনো এসিড। আঙুল দিয়ে টেনে ঘোরাও।

জৈব পলিমার নির্মাতা

Biopolymer builder — sugars, starch, cellulose, proteins
↗
3D লোড হচ্ছে…
α-গ্লুকোজ + α-গ্লুকোজ
α-Glcβ-GlcFruO
বাম (C1 দেবে):
ডান:
ডানের কার্বন:

β বন্ধনে ডান বলয়টি উল্টে যায় (তার CH₂OH নিচে চলে যায়) — 3D মডেল ঘুরিয়ে দেখো। বলয়গুলো প্রতীকী সমতল ষড়ভুজ; আসলে গ্লুকোজ বলয় চেয়ার আকৃতির (chair)।

চ্যালেঞ্জ (challenges)

0/6
  1. দুটি α-গ্লুকোজ জুড়ে মল্টোজ বানাও এবং বলো এতে কোন বন্ধন
  2. সুক্রোজ (চিনি) বানাও
  3. সেলুলোজের শিকল পাশাপাশি সাজাও — কেন এরা জমে শক্ত তন্তু হয়?
  4. অ্যামাইলোজকে (অন্তত 12 একক) আয়োডিনে নীল করো
  5. ইনসুলিনের দুই শিকলে মোট পেপটাইড বন্ধন কয়টি?
  6. প্রোটিন গরম করে স্বভাবচ্যুত করো — কোন স্তরের গঠন টিকে থাকে?

পর্যবেক্ষণ খাতা (observation notebook)

কিছু জোড়া লাগালে, আয়োডিন দিলে বা প্রোটিন রেকর্ড করলে তথ্য এখানে জমা হবে।

বই পড়ার সময় সাবধান — পাঠ্যবইয়ের এই অংশে কয়েকটি ভুল আছে:

  • বইয়ে (২.২০) “পলিস্যাকারাইড বলতে সেলুলোজ, গ্লুকোজ ও গ্লাইকোজেন” → গ্লুকোজ মনোস্যাকারাইড; তালিকায় হবে স্টার্চ।
  • বইয়ের ফিশার চিত্রে “পেন্টোজ (রাইবোজ)” লেখা অণুতে C3-এর OH বাঁয়ে → এটি D-জাইলোজ (xylose)। D-রাইবোজে C2, C3, C4 — তিনটির OH-ই ডানে।
  • “চিনি বা সুক্রোজ হলো গ্লুকোজের ডাইস্যাকারাইড” → সুক্রোজ = গ্লুকোজ + ফ্রুক্টোজ (α1↔2β), অবিজারক। গ্লুকোজ + গ্লুকোজ (α-1,4) হলো মল্টোজ।
  • অ্যামাইলোপেকটিনের শাখাকে “ক্রস-লিংক” বলা হয়েছে → এগুলো α-1,6 শাখা-বিন্দু (branch point), দুটি শিকলের মধ্যে সংযোগ নয়।
  • “R = –CH₂SH হলে সিস্টিন” (চিত্র ২.৩১-এও) → –CH₂SH হলো সিস্টেইন (cysteine); দুটি সিস্টেইন S–S বন্ধনে যুক্ত হলে সিস্টিন (cystine)।
  • “ইনসুলিনে 51টি অ্যামাইনো এসিড, 50টি পেপটাইড বন্ধন” → ইনসুলিনে দুটি শিকল (21 + 30), তাই 49টি পেপটাইড বন্ধন আর 3টি S–S সেতু (UniProt P01308)।
  • “অস্থির উপরিস্থিত মায়োগ্লোবিন” → মায়োগ্লোবিন পেশির (muscle) প্রোটিন। আর হিমোগ্লোবিনকে টারশিয়ারি প্রোটিনের তালিকায় রাখা হয়েছে → এটি চারটি শিকলের কোয়াটারনারি প্রোটিন।
  • “কিছু পলিস্যাকারাইড N পরমাণুর মাধ্যমে পিরিমিডিন/পিউরিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিউক্লিক এসিড গঠন করে” → নিউক্লিক এসিডে পেন্টোজ (রাইবোজ/ডিঅক্সিরাইবোজ) শর্করা ক্ষারকের সঙ্গে N-গ্লাইকোসাইড বন্ধনে নিউক্লিওটাইড বানায়; এটি পলিস্যাকারাইড নয়।
  • সেলুলোজে গ্লুকোজের সংখ্যা বইয়ে কোথাও “প্রায় 3000”, কোথাও “300–3000” → প্রকৃতিভেদে 300 থেকে 10 000-এর বেশি; তুলায় প্রায় 10 000।
  • ছোটখাটো সরলীকরণ (বোর্ড মেনে নেয়): “অ্যামাইলোজ গরম পানিতে দ্রবণীয়, অ্যামাইলোপেকটিন অদ্রবণীয়”; আয়োডিন জটিলকে শুধু I₃⁻ লেখা (আসলে I₃⁻/I₅⁻ সারি); “৫০ বা তার বেশি অ্যামাইনো এসিড হলে প্রোটিন” — এটি একটি প্রচলিত সীমারেখা, কঠোর নিয়ম নয়। বইয়ের MCQ-2.35-এ “দুটি পেপটাইড শিকল কোন বন্ধনে যুক্ত”-এর উত্তর H-বন্ধন দেওয়া; ইনসুলিনের মতো প্রোটিনে শিকল দুটি S–S সমযোজী সেতুতেও যুক্ত — দুটি উত্তরই যুক্তিসংগত।

ঘরে বসে পরীক্ষা

(ক) স্টার্চ-আয়োডিন পরীক্ষা। ফার্মেসির টিংচার আয়োডিন (tincture of iodine) এক ফোঁটা করে দাও: একটি কাটা আলুর টুকরায়, এক চামচ ভাতে, আর একটু তুলা বা টিস্যু পেপারে। আলু আর ভাত কয়েক সেকেন্ডে নীল-কালো হবে (স্টার্চ), তুলায় শুধু আয়োডিনের হলদে-বাদামি দাগ থাকবে (সেলুলোজ)। চাইলে ভাত কিছুক্ষণ চিবিয়ে থুতুর সঙ্গে মিশিয়ে আবার পরীক্ষা করো — অ্যামাইলেজ স্টার্চ ভাঙলে নীল রং কম হয়।

(খ) প্রোটিনের স্বভাবচ্যুতি। একটি চামচে একটু ডিমের সাদা অংশ নিয়ে গরম পানির বাটিতে চামচটি ধরো — স্বচ্ছ তরল সাদা ও শক্ত হয়ে যাবে। আরেকটি কাপে একটু গরম দুধে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস দাও — ছানা (দলা পাকানো প্রোটিন) আলাদা হবে। ঠান্ডা করলেও এগুলো আর আগের মতো হয় না।

নিরাপত্তা: টিংচার আয়োডিন গিলে ফেললে বিষাক্ত, আর কাপড়-চামড়ায় দাগ ফেলে — পরীক্ষা করা খাবার খেয়ো না, ফেলে দাও, হাত ধুয়ে নাও। গরম পানি ও চুলা বড়দের সামনে ব্যবহার করো।

পরীক্ষার প্রস্তুতি

১. α- ও β-গ্লাইকোসাইড বন্ধন কী? গঠন এঁকে পার্থক্য দেখাও। (জ্ঞান + অনুধাবন)

দুটি মনোস্যাকারাইডের একটির অ্যানোমেরিক কার্বনের (গ্লুকোজের C1) –OH আর অন্যটির একটি –OH থেকে এক অণু পানি অপসারিত হয়ে যে C–O–C বন্ধন হয়, তাই গ্লাইকোসাইড বন্ধন।

  • α-1,4: α-D-গ্লুকোজের C1 (OH নিচে, হাওয়ার্থে) + পরের গ্লুকোজের C4 → মল্টোজ; শিকলে বারবার → স্টার্চ (অ্যামাইলোজ)।
  • β-1,4: β-D-গ্লুকোজের C1 (OH উপরে) + পরের গ্লুকোজের C4; বন্ধন গঠনে দ্বিতীয় বলয়টি উল্টে যায় → সেলোবায়োজ; শিকলে → সেলুলোজ।

ফলাফল: α-1,4 শিকল একটু একটু বেঁকে কুণ্ডলী হয়; β-1,4 শিকল সোজা ফিতা হয়, পাশের শিকলের সঙ্গে H-বন্ধনে তন্তু গড়ে।

২. স্টার্চ ও সেলুলোজ দুটিই গ্লুকোজের পলিমার। তবু মানুষ স্টার্চ হজম করতে পারে কিন্তু সেলুলোজ পারে না — বিশ্লেষণ করো। (সৃজনশীল ঘ)
  • মনোমার ও বন্ধন: স্টার্চ α-D-গ্লুকোজের α-1,4 (অ্যামাইলোপেকটিনে আরও α-1,6 শাখা) বন্ধনে; সেলুলোজ β-D-গ্লুকোজের β-1,4 বন্ধনে।
  • আকৃতি: α-1,4 শিকল কুণ্ডলী (প্রতি পাকে 6টি গ্লুকোজ); β-1,4 শিকলে প্রতি দ্বিতীয় গ্লুকোজ উল্টানো, শিকল সোজা, শিকলগুলো H-বন্ধনে আঁটসাঁট তন্তু — পানি বা এনজাইম ঢুকতে পারে না।
  • এনজাইম: লালা ও অগ্ন্যাশয়ের অ্যামাইলেজ শুধু α-1,4 বন্ধনের আকৃতি চেনে → স্টার্চ ভেঙে মল্টোজ, পরে গ্লুকোজ হয়ে রক্তে শোষিত হয়। β-1,4 ভাঙার সেলুলেজ মানুষ তৈরি করে না, তাই সেলুলোজ অপরিবর্তিত বেরিয়ে যায় (খাদ্য-আঁশ)। তৃণভোজী প্রাণীর পেটের অণুজীব সেলুলেজ দেয়।

সুতরাং পার্থক্য এককে নয়, বন্ধনের ত্রিমাত্রিক বিন্যাসে।

৩. স্টার্চ দ্রবণে আয়োডিন দ্রবণ দিলে গাঢ় নীল হয় কেন? সেলুলোজে হয় না কেন?

আয়োডিন KI দ্রবণে I2+I−→I3−\mathrm{I_2 + I^- \rightarrow I_3^-} হিসেবে থাকে। স্টার্চের অ্যামাইলোজ অংশ কুণ্ডলী (helix) আকৃতির; এর ফাঁপা কেন্দ্রে (প্রায় 0.5 nm) I₃⁻/I₅⁻ আয়নের লম্বা সারি আটকে যায় (inclusion complex)। এই জটিল যৌগ দৃশ্যমান আলোর কমলা-লাল অংশ (≈ 620 nm) শোষণ করে, তাই বাকি আলো গাঢ় নীল দেখায়। সেলুলোজের সোজা শিকলে কুণ্ডলী নেই, আয়োডিন বসার জায়গা নেই — রং হয় না। (অ্যামাইলোপেকটিনের ছোট শাখায় ছোট কুণ্ডলী → লালচে বেগুনি।)

৪. গ্লাইসিন ও অ্যালানিন থেকে কয়টি ডাইপেপটাইড সম্ভব? একটির গঠন সমীকরণসহ লেখো। ইনসুলিনের (A শিকল 21, B শিকল 30টি অ্যামাইনো এসিড) পেপটাইড বন্ধন কয়টি?

ভিন্ন ক্রমে দুটি: Gly–Ala ও Ala–Gly (একই অ্যামাইনো এসিড দুবার নিলে Gly–Gly ও Ala–Ala-ও হয় — মোট 4টি)।

H2N−CH2−COOH+H2N−CH(CH3)−COOH⟶H2N−CH2−CO−NH−CH(CH3)−COOH+H2O\mathrm{H_2N{-}CH_2{-}COOH + H_2N{-}CH(CH_3){-}COOH \longrightarrow H_2N{-}CH_2{-}CO{-}NH{-}CH(CH_3){-}COOH + H_2O}

ইনসুলিন: প্রতিটি শিকলে n − 1 → (21 − 1) + (30 − 1) = 49টি পেপটাইড বন্ধন (বইয়ের 50 ভুল — শিকল দুটি পেপটাইড বন্ধনে নয়, S–S সেতুতে যুক্ত)।

৫. জুইটার আয়ন কী? গ্লাইসিনের গলনাঙ্ক সাধারণ জৈব যৌগের তুলনায় অনেক বেশি কেন?

অ্যামাইনো এসিডের –COOH থেকে H⁺ একই অণুর –NH₂-এ চলে গিয়ে H3N+−CHR−COO−\mathrm{H_3N^+{-}CHR{-}COO^-} হয় — একই অণুতে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ, মোট চার্জ শূন্য: জুইটার আয়ন। কঠিন অবস্থায় গ্লাইসিন এই আয়ন রূপে থাকে; পাশের অণুর +/− প্রান্তের মধ্যে শক্তিশালী আয়নিক আকর্ষণ লবণের কেলাসের মতো, তাই গলনাঙ্ক অনেক বেশি (প্রায় 233 °C-এ গলে বিযোজিত হয়), আর পানিতে সহজে দ্রবণীয় কিন্তু ইথারের মতো অপোলার দ্রাবকে অদ্রবণীয়।

৬. প্রোটিনের স্বভাবচ্যুতি কী? ডিম সেদ্ধ করলে কোন স্তরের গঠন নষ্ট হয় আর কোনটি থাকে? (সৃজনশীল গ)

তাপ, এসিড-ক্ষার, অ্যালকোহল ইত্যাদির প্রভাবে প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন নষ্ট হয়ে ধর্ম ও কাজ বদলে যাওয়াই স্বভাবচ্যুতি। ডিমের অ্যালবুমিন গরম করলে H-বন্ধন, আয়নিক আকর্ষণ ও হাইড্রোফোবিক টান ভেঙে 2° (α-হেলিক্স/β-শিট) ও 3° গঠন হারায়; খুলে যাওয়া শিকলগুলো একে অপরের সঙ্গে জট পাকিয়ে অদ্রবণীয়, অস্বচ্ছ, শক্ত দলা হয়। পেপটাইড বন্ধন সমযোজী, তাই 1° গঠন (অ্যামাইনো এসিডের ক্রম) অক্ষত থাকে। এ পরিবর্তন অপরিবর্তনীয় — ঠান্ডা করলে ডিম আর কাঁচা হয় না।