পাঠ ৫ / ৮অনুচ্ছেদ ২.৩ (মায়োসিস-১)
মায়োসিস: প্রকার ও মায়োসিস-১Meiosis: types & meiosis I (the five stages of prophase I)
তোমার দেহের প্রতিটি কোষে 46টি ক্রোমোসোম — 23টি মায়ের কাছ থেকে, 23টি বাবার কাছ থেকে। কিন্তু মা-বাবার দেহকোষেও তো 46টি করে! ধরো তাদের দেহকোষই সরাসরি মিলে সন্তান তৈরি হলো। নিচে “পরের প্রজন্ম” চেপে দেখো কী ঘটে:
দুই বাবা-মায়ের দেহকোষ (46 + 46) সরাসরি গ্যামেট হলে সন্তানের কোষে কতটি ক্রোমোসোম?
তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্রোমোসোম সংখ্যা 46-এ স্থির থাকে কীভাবে? উত্তর একটি বিশেষ কোষ বিভাজন — মায়োসিস (meiosis)। এই পাঠে ধাপে ধাপে এগোব:
- সমস্যাটা — কেন জননকোষে ক্রোমোসোম অর্ধেক হতেই হবে
- মায়োসিস কী: একবার প্রতিলিপন, দুবার বিভাজন; একটু ইতিহাস
- কোথায় ঘটে: গ্যামেটিক (gametic), স্পোরিক (sporic) ও জাইগোটিক (zygotic) মায়োসিস
- সমসংস্থ ক্রোমোসোম (homologous chromosomes) আর জোড়া বাঁধা
- প্রোফেজ-১ (prophase I)-এর পাঁচ উপপর্যায়
- মেটাফেজ-১ ও অ্যানাফেজ-১ — যেখানে সংখ্যা অর্ধেক হয়
- টেলোফেজ-১ ও ইন্টারকাইনেসিস (interkinesis)
- এবার নিজে করে দেখো — মায়োসিস-১ ল্যাব
আগে জেনে নাও: ক্রোমোসোমের গঠন ও 2n/n (পাঠ ১), আর মাইটোসিসের দশাগুলো (পাঠ ৩)।
ধাপ ১: সমস্যাটা — প্রতি প্রজন্মে দ্বিগুণ
যৌন জনন (sexual reproduction) মানে দুটি জননকোষ বা গ্যামেট (gamete) — শুক্রাণু আর ডিম্বাণু — মিলে একটি জাইগোট (zygote) তৈরি হওয়া, যাকে বলে নিষেক (fertilisation)। গ্যামেট যদি দেহকোষের মতো 2n = 46 হতো, তবে জাইগোট হতো 92, পরের প্রজন্মে 184, তারপর 368 … প্রতি প্রজন্মে দ্বিগুণ। বাস্তবে এমন কোষ টিকতে পারে না।
সমাধান: গ্যামেট তৈরির আগে ক্রোমোসোম সংখ্যা অর্ধেক করা — 2n থেকে n (হ্যাপ্লয়েড, haploid)। তখন n + n = 2n, নিষেক সংখ্যাটা আবার ফিরিয়ে আনে। মানুষে: 23 + 23 = 46।
একটি প্রাণীর দেহকোষে 2n = 20। এর শুক্রাণু ও জাইগোটে কতটি ক্রোমোসোম?
ধাপ ২: মায়োসিস কী
যে কোষ বিভাজনে একটি ডিপ্লয়েড (2n) কোষের নিউক্লিয়াস পরপর দুবার বিভাজিত হয়, কিন্তু ক্রোমোসোম (DNA) একবারই প্রতিলিপিত হয়, ফলে চারটি হ্যাপ্লয়েড (n) কোষ তৈরি হয়, তাকে মায়োসিস (meiosis) বলে। গ্রিক meiōsis মানে “হ্রাস (lessening)”। একে হ্রাস বিভাজন (reduction division)-ও বলে।
- DNA প্রতিলিপন হয় মায়োসিস শুরুর আগেই, মায়োসিসের আগের ইন্টারফেজের S দশায় — ঠিক মাইটোসিসের মতো।
- মায়োসিস-১ (meiosis I): সমসংস্থ ক্রোমোসোম জোড়া আলাদা হয় → ক্রোমোসোম সংখ্যা 2n থেকে n। একে হ্রাসমূলক (reductional) বিভাজন বলে।
- মায়োসিস-২ (meiosis II): প্রতিটি ক্রোমোসোমের দুই সিস্টার ক্রোমাটিড আলাদা হয় — ঠিক মাইটোসিসের মতো, সংখ্যা n-ই থাকে। একে সমীকরণিক (equational) বিভাজন বলে। (মায়োসিস-২ বিস্তারিত পরের পাঠে।)
একটু ইতিহাস (বইয়ের সাল-নাম নয়, যাচাই করা তথ্য):
| কে | কবে | কী |
|---|---|---|
| অস্কার হার্টউইগ (Oscar Hertwig) | 1876 | সামুদ্রিক আর্চিনের ডিমে মায়োসিসের প্রথম বর্ণনা |
| এদুয়ার ভ্যান বেনেডেন (É. Van Beneden) | 1883 | গোলকৃমি Ascaris-এর গ্যামেটে ক্রোমোসোম অর্ধেক |
| এডুয়ার্ড স্ট্রাসবুর্গার (E. Strasburger) | 1888 | উদ্ভিদে হ্রাস বিভাজন |
| ফার্মার ও মুর (J. B. Farmer & J. E. S. Moore) | 1905 | “maiosis” নাম দেন, পরে বানান হয় meiosis |
মায়োসিসে DNA প্রতিলিপন কতবার এবং কখন হয়?
ধাপ ৩: কোথায় ঘটে — মায়োসিসের প্রকার
মায়োসিস ঘটে শুধু জনন মাতৃকোষে (meiocyte) — যেমন শুক্রাশয়ের প্রাইমারি স্পার্মাটোসাইট, ডিম্বাশয়ের প্রাইমারি উসাইট, পরাগধানীর পরাগ মাতৃকোষ। দেহকোষে (somatic cell) কখনো নয়। জীবনচক্রের কোন জায়গায় ঘটে, সে অনুযায়ী তিন প্রকার:
| প্রকার | কখন | উদাহরণ |
|---|---|---|
| গ্যামেটিক বা অন্তিম (gametic / terminal) | গ্যামেট তৈরির ঠিক আগে | প্রাণী — মানুষের শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় |
| স্পোরিক বা মধ্যবর্তী (sporic / intermediate) | স্পোর (spore) তৈরির সময় | সপুষ্পক উদ্ভিদের পরাগধানীর মাইক্রোস্পোর মাতৃকোষ ও ডিম্বকের মেগাস্পোর মাতৃকোষ; ফার্ন, মস |
| জাইগোটিক বা প্রারম্ভিক (zygotic / initial) | নিষেকের পরপরই, জাইগোটে | অনেক শৈবাল ও ছত্রাক, যেমন Chlamydomonas |
Chlamydomonas-এর জীবনচক্রে একমাত্র ডিপ্লয়েড কোষ হলো জাইগোট, আর সেটিই মায়োসিসে ভাগ হয়। এটি কোন প্রকার মায়োসিস?
ধাপ ৪: সমসংস্থ ক্রোমোসোম আর জোড়া বাঁধা
2n কোষে প্রতিটি ক্রোমোসোমের একটি “জোড়া” থাকে: একটি এসেছে মায়ের ডিম্বাণু থেকে (মাতৃ, maternal), একটি বাবার শুক্রাণু থেকে (পিতৃ, paternal)। এই জোড়ার দুই সদস্যকে বলে সমসংস্থ ক্রোমোসোম (homologous chromosomes):
- দৈর্ঘ্য আর সেন্ট্রোমিয়ারের (centromere) অবস্থান একই;
- একই জায়গায় (লোকাস, locus) একই জিন — কিন্তু জিনের রূপ বা অ্যালিল (allele) ভিন্ন হতে পারে (যেমন A আর a)।
মায়োসিস-১-এর আসল কাজ এই জোড়াগুলোকে খুঁজে মেলানো, আর তারপর আলাদা করা। জোড়া বাঁধাকে বলে সিন্যাপসিস (synapsis); জোড়া বাঁধা দুটি সমসংস্থ ক্রোমোসোমকে একসাথে বলে বাইভ্যালেন্ট (bivalent)। যেহেতু প্রতিটি ক্রোমোসোমে দুটি ক্রোমাটিড, একটি বাইভ্যালেন্টে মোট 4টি ক্রোমাটিড — তাই একে টেট্রাড (tetrad)-ও বলে। নিচে নিজে জোড়া মেলাও:
একটি ক্রোমোসোমে ট্যাপ করো, তারপর তার সমসংস্থ (homologous) জোড়ায়।
ধানের (2n = 24) একটি জনন মাতৃকোষে জাইগোটিনের শেষে কয়টি বাইভ্যালেন্ট আর মোট কয়টি ক্রোমাটিড?
ধাপ ৫: প্রোফেজ-১ — পাঁচ উপপর্যায়
মায়োসিস-১-এর প্রোফেজ সবচেয়ে দীর্ঘ আর ঘটনাবহুল দশা। ঘটনার ভিত্তিতে একে পাঁচটি উপপর্যায়ে (sub-stage) ভাগ করা হয়। নামগুলো গ্রিক শব্দ থেকে, আর শেষের -tene এসেছে tainia (ফিতা, ribbon) থেকে:
| উপপর্যায় | গ্রিক মূল | মূল ঘটনা |
|---|---|---|
| লেপ্টোটিন (leptotene) | leptos = সরু | লম্বা, সরু সুতা; গায়ে পুঁতির মতো ক্রোমোমিয়ার (chromomere)। সিস্টার ক্রোমাটিড আগেই আছে, আলাদা দেখা যায় না। অনেক প্রাণিকোষে সুতার প্রান্ত পর্দার এক দিকে জড়ো হয় — বুকে (bouquet) দশা |
| জাইগোটিন (zygotene) | zygon = জোয়াল, জোড়া | সমসংস্থ জোড়া বাঁধে — সিন্যাপসিস; চেইনের মতো আটকে রাখে সিন্যাপটোনেমাল কমপ্লেক্স (synaptonemal complex)। বাইভ্যালেন্ট সংখ্যা = n |
| প্যাকাইটিন (pachytene) | pachys = মোটা | ক্রোমোসোম খাটো-মোটা; 4টি ক্রোমাটিড স্পষ্ট (টেট্রাড)। নন-সিস্টার ক্রোমাটিডের মধ্যে অংশ বিনিময় — ক্রসিংওভার (crossing over) |
| ডিপ্লোটিন (diplotene) | diplos = দ্বিগুণ | সিন্যাপটোনেমাল কমপ্লেক্স সরে যায়; জোড়া সরে যেতে চায়, কিন্তু আটকে থাকে X-আকৃতির কায়াজমায় (chiasma, বহুবচন chiasmata)। কায়াজমা প্রান্তের দিকে সরে — প্রান্তীয়করণ (terminalisation) |
| ডায়াকাইনেসিস (diakinesis) | dia = মধ্য দিয়ে, kinesis = চলন | সর্বোচ্চ ঘনীভবন; প্রান্তীয়করণ সম্পূর্ণ; বাইভ্যালেন্ট নিউক্লিয়াসের কিনারায় ছড়ায়; নিউক্লিওলাস ও নিউক্লিয়ার পর্দা মিলিয়ে যায়, স্পিন্ডল তৈরি শুরু |
একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: ক্রসিংওভার একটি ঘটনা (DNA-র স্তরে অংশ বিনিময়, প্যাকাইটিনে), আর কায়াজমা তার দৃশ্যমান চিহ্ন (অণুবীক্ষণে স্পষ্ট হয় ডিপ্লোটিনে)। ট্যাবগুলো ঘুরে দেখো, তারপর নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও:
লেপ্টোটিন (leptotene)
- ক্রোমোসোম লম্বা, সরু সুতার মতো; গায়ে পুঁতির মতো ক্রোমোমিয়ার (chromomere)
- সিস্টার ক্রোমাটিড আগেই তৈরি (S দশায়), কিন্তু আলাদা দেখা যায় না
- অনেক প্রাণিকোষে সুতার প্রান্তগুলো নিউক্লিয়ার পর্দার এক দিকে জড়ো হয় — বুকে (bouquet) বিন্যাস
কত সময় লাগে? মানুষের পুরুষে প্রাইমারি স্পার্মাটোসাইট দশা — মূলত প্রোফেজ-১ — প্রায় 24 দিন; পুরো শুক্রাণু তৈরি (spermatogenesis) প্রায় 64–74 দিন। নারীর ডিম্বাণু (oocyte) জন্মের আগেই প্রোফেজ-১ শুরু করে ডিপ্লোটিনে থেমে থাকে (ডিক্টিয়েট দশা, dictyate arrest) — ডিম্বস্ফোটনের (ovulation) আগে পর্যন্ত, অর্থাৎ 12 থেকে 50 বছর!
অণুবীক্ষণে একটি কোষে বাইভ্যালেন্টের দুই সমসংস্থ ক্রোমোসোম আলাদা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কয়েকটি X-আকৃতির বিন্দুতে আটকে আছে; নিউক্লিয়ার পর্দা অক্ষত। কোষটি কোন উপপর্যায়ে?
ধাপ ৬: মেটাফেজ-১ ও অ্যানাফেজ-১ — সংখ্যা অর্ধেক হয় এখানে
মেটাফেজ-১ (metaphase I): স্পিন্ডল তন্তু (spindle fibre) কাইনেটোকোরে যুক্ত হয়, আর বাইভ্যালেন্টগুলো (একক ক্রোমোসোম নয়!) বিষুবীয় তলে (metaphase plate) সাজে। মাইটোসিসের সাথে মূল পার্থক্য:
- একটি সমসংস্থ ক্রোমোসোমের দুই সিস্টারের কাইনেটোকোর একই মেরুর দিকে মুখ করে; জোড়ার অন্য সদস্য বিপরীত মেরুর দিকে।
- কায়াজমা জোড়াকে টানের মধ্যে ধরে রাখে, তাই দুটি একসাথে এক মেরুতে চলে যেতে পারে না।
- কোন সমসংস্থ কোন মেরুর দিকে মুখ করবে, তা প্রতিটি বাইভ্যালেন্টে দৈব (random) — নিচে উল্টে দেখো কত রকম মিশ্রণ হয়:
একটি বাইভ্যালেন্টে ট্যাপ করে উল্টাও। বাম মেরুর আলাদা মিশ্রণ পাওয়া গেল 1 / 8 (= 2³)
অ্যানাফেজ-১ (anaphase I): কায়াজমা খুলে যায়, আর প্রতিটি সমসংস্থ ক্রোমোসোম — দুটি ক্রোমাটিডসহ — এক মেরুতে যায়। সেন্ট্রোমিয়ার ভাগ হয় না (মাইটোসিসের অ্যানাফেজে যা হয়)। তাই প্রতি মেরুতে যায় n সংখ্যক ক্রোমোসোম — এটাই হ্রাস (reduction)। মানুষের হিসাব (DNA অণু = ক্রোমাটিড):
| দশা | ক্রোমোসোম | ক্রোমাটিড | বাইভ্যালেন্ট | DNA |
|---|---|---|---|---|
| মায়োসিসের আগের G1 | 46 | 46 | 0 | 2C = 6.4 pg |
| প্রোফেজ-১ (জাইগোটিন থেকে) ও মেটাফেজ-১ | 46 | 92 | 23 | 4C = 12.8 pg |
| অ্যানাফেজ-১ (পুরো কোষ) | 46 (প্রতি মেরুতে 23) | 92 | 0 | 4C |
| টেলোফেজ-১ (প্রতি নিউক্লিয়াস) | 23 | 46 | 0 | 2C = 6.4 pg |
অ্যানাফেজ-১-এ কী আলাদা হয়?
ধাপ ৭: টেলোফেজ-১ ও ইন্টারকাইনেসিস
টেলোফেজ-১ (telophase I): ক্রোমোসোম দুই মেরুতে পৌঁছায়, অনেক জীবে চারপাশে নিউক্লিয়ার পর্দা ও নিউক্লিওলাস ফিরে আসে — দুটি নিউক্লিয়াস, প্রতিটি n, তবে প্রতিটি ক্রোমোসোমে এখনো 2টি ক্রোমাটিড (2C)। এরপর সাইটোকাইনেসিস-১ (cytokinesis I) — সাইটোপ্লাজম ভাগ — হতেও পারে, না-ও হতে পারে (যেমন অনেক একবীজপত্রী উদ্ভিদে দুটি কোষ হয়, অনেক দ্বিবীজপত্রীতে চারটি নিউক্লিয়াস হওয়ার পর একসাথে ভাগ হয়)।
ইন্টারকাইনেসিস (interkinesis): মায়োসিস-১ আর মায়োসিস-২-এর মাঝের ছোট বিরতি। এটি মাইটোসিসের ইন্টারফেজের মতো দেখালেও এতে কোনো DNA প্রতিলিপন (S দশা) হয় না — কারণ ক্রোমোসোমগুলোর তো আগে থেকেই দুটি করে ক্রোমাটিড আছে। কিছু জীবে ইন্টারকাইনেসিস থাকেই না; টেলোফেজ-১ থেকে সরাসরি প্রোফেজ-২।
মায়োসিস-১-এর পরের দুটি কোষে n ক্রোমোসোম। তবু এদের DNA 1C নয়, 2C। কেন?
ধাপ ৮: এবার নিজে করে দেখো — মায়োসিস-১ ল্যাব
নিচে একটি 2n = 6 জনন মাতৃকোষ — 3 জোড়া সমসংস্থ ক্রোমোসোম, আকারে আলাদা (মেটাসেন্ট্রিক, সাবমেটাসেন্ট্রিক, অ্যাক্রোসেন্ট্রিক)। পুরো মায়োসিস-১ নিজের হাতে করো:
- লেপ্টোটিন: একটি ক্রোমোসোমে ট্যাপ করো, তারপর তার সমসংস্থে — সব জোড়া বাঁধলেই জাইগোটিন।
- প্যাকাইটিন: প্রতিটি বাইভ্যালেন্টের যেখানে ক্রসিংওভার চাও, সেখানে ট্যাপ করো; বিন্দুর ওপারের অংশ রং বদলায়।
- ডিপ্লোটিন: কায়াজমা খুঁজে নাও, স্লাইডার টেনে প্রান্তীয়করণ করো।
- মেটাফেজ-১: প্রতিটি বাইভ্যালেন্টে ট্যাপ করে তন্তু জোড়ো; আবার ট্যাপ করলে জোড়া উল্টায়। তারপর টানো।
- উপরের চিপে প্রতিটি ধাপে ক্রোমোসোম, ক্রোমাটিড, বাইভ্যালেন্ট আর DNA দেখো; জীব (organism) বদলে মানুষ, পেঁয়াজ, মটর, ফলের মাছি বা ধানের জন্য একই হিসাব দেখো, আর খাতায় লেখো।
মায়োসিস-১ ল্যাব (meiosis I lab)
জোড়া বাঁধাও, ক্রসিংওভার করো, টেনে আলাদা করোএকটি ক্রোমোসোমে ট্যাপ করো, তারপর তার সমসংস্থ (homologous) জোড়ায় — সিন্যাপসিস।
চ্যালেঞ্জ (challenges)
0/6- প্রতিটি ক্রোমোসোমকে তার সমসংস্থ জোড়ার সাথে মেলাও। কয়টি বাইভ্যালেন্ট হলো?
- প্যাকাইটিনে প্রতিটি বাইভ্যালেন্টে অন্তত একটি ক্রসিংওভার দাও, তারপর ডিপ্লোটিনে কায়াজমা খুঁজে বের করো।
- “পরীক্ষা মোড” চালু করে একটি বাইভ্যালেন্টে কোনো ক্রসিংওভার না দিয়ে টানো। কী হতে পারে? (কয়েকবার রিসেট করে দেখো)
- অ্যানাফেজ-১-এর পর প্রতি মেরুতে গোনো (মডেল 2n = 6): ক্রোমোসোম, ক্রোমাটিড, DNA (C) — নিচে লেখো।
- জীব বদলে পেঁয়াজ (onion, 2n = 16) নাও, প্যাকাইটিনে “খাতায় লেখো” চাপো।
- মানুষের ডিম্বাণু দশকের পর দশক কোন উপপর্যায়ে থেমে থাকে? নিচে বেছে নাও।
পর্যবেক্ষণ খাতা (observation notebook)
কোনো উপপর্যায়ে “খাতায় লেখো” চাপো।
বই পড়ার সময় সাবধান — পাঠ্যবইয়ের এই অংশে কিছু ভুল আছে:
- পৃ. 89: “বেনেডিন ও হাউসার Ascaris-এর গ্যামেটে হ্যাপ্লয়েড ক্রোমোসোম আবিষ্কার করেন, ১৮৮৩” — আবিষ্কারটি এদুয়ার ভ্যান বেনেডেন-এর একার (1883); “হাউসার” নামে কেউ এর সাথে যুক্ত নন। মায়োসিসের প্রথম বর্ণনা অস্কার হার্টউইগের, 1876 (সামুদ্রিক আর্চিনের ডিম)। বোর্ডের উত্তরে লেখো “Van Beneden, 1883”।
- পৃ. 89: “বোভেরী সর্বপ্রথম গোলকৃমির জননাঙ্গে মায়োসিস প্রত্যক্ষ করেন” — বোভেরীর কাজ (1887 থেকে) হার্টউইগ ও ভ্যান বেনেডেনের পরে; “সর্বপ্রথম” ভুল।
- পৃ. 89: ফার্মার ও মুর 1905 সালে যে নাম দেন তা “maiosis” (বইয়ে “Miosis”); পরে বানান হয় meiosis। নাম ও সাল ঠিক আছে।
- পৃ. 90: “মানুষের শুক্রাশয়ে মায়োটিক প্রোফেজে এক সপ্তাহ, বিভাজন শেষ হতে প্রায় এক মাস” — প্রাইমারি স্পার্মাটোসাইট দশা (মূলত প্রোফেজ-১) প্রায় 24 দিন; মায়োসিস-২ কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার; পুরো শুক্রাণু তৈরি 64–74 দিন। নারীতে প্রোফেজ-১ চলে ভ্রূণ অবস্থা থেকে ডিম্বস্ফোটন পর্যন্ত (12–50 বছর)।
- পৃ. 91, 99, 100: “প্যাকাইটিনে প্রতিটি ক্রোমোসোম লম্বালম্বি দুটি ক্রোমাটিডে বিভক্ত হয়” — ক্রোমাটিড তৈরি হয়েছে মায়োসিসের আগের S দশায়; প্যাকাইটিনে সেগুলো কেবল দেখা যায়। (বইয়ের পৃ. 90 নিজেই বলে DNA আগে দ্বিগুণ হয়।)
- পৃ. 91: বুকে (bouquet) দশার সাথে “বিজ্ঞানী ডার্লিংটন”-এর নাম — এই বিন্যাস ডার্লিংটনের বহু আগেই বর্ণিত (নামটি Eisen, 1900)। নামটি বাদ দাও।
- পৃ. 91–92: “প্যাকাইটিনের শেষে কায়াজমা তৈরি হয়” — মোটামুটি ঠিক, তবে পার্থক্যটা মনে রাখো: ক্রসিংওভার (অংশ বিনিময়) ঘটে প্যাকাইটিনে, কায়াজমা দেখা যায় ডিপ্লোটিনে।
- পৃ. 93: শিরোনাম “ইন্টারকাইনেসিস বা সাইটোকাইনেসিস-১” — দুটি এক জিনিস নয়। সাইটোকাইনেসিস-১ হলো টেলোফেজ-১-এর শেষে সাইটোপ্লাজমের ভাগ (হতেও পারে, না-ও পারে); ইন্টারকাইনেসিস হলো মায়োসিস-১ ও ২-এর মাঝের বিরতি। শিরোনামের নিচের কথা — ইন্টারকাইনেসিসে DNA প্রতিলিপন হয় না — ঠিক।
ঘরে বসে পরীক্ষা
পাইপ-ক্লিনার বা দড়ির মডেলে সিন্যাপসিস আর ক্রসিংওভার। লাগবে: দুই রঙের পাইপ-ক্লিনার (বা লাল ও নীল উলের সুতা/দড়ি), কাঁচি, স্কচটেপ, কয়েকটি বোতাম বা ছোট কাগজের টুকরো (সেন্ট্রোমিয়ার), মোবাইল ক্যামেরা।
- লাল রঙের দুটি সমান টুকরো (ধরো 12 cm) একটি বোতামে মাঝখানের একটু ওপরে জুড়ে দাও — এটি একটি মাতৃ ক্রোমোসোম, দুই সিস্টার ক্রোমাটিডসহ। নীল দিয়ে একই মাপের পিতৃ ক্রোমোসোম বানাও। একই নিয়মে ছোট আরেকটি জোড়া (8 cm) বানাও — মোট 2n = 4।
- লেপ্টোটিন থেকে ডায়াকাইনেসিস পর্যন্ত টেবিলে সাজিয়ে প্রতিটির ছবি তোলো: আলাদা সুতা → জোড়া পাশাপাশি (জাইগোটিন) → চারটি ক্রোমাটিড গায়ে গায়ে (প্যাকাইটিন)।
- ক্রসিংওভার: একটি লাল ও একটি নীল নন-সিস্টার ক্রোমাটিড একই জায়গায় কাটো, আর কাটা প্রান্ত দুটি বদলে টেপ দিয়ে জোড়ো। এখন সেখানে X বানিয়ে রাখো — এটি কায়াজমা (ডিপ্লোটিন)।
- দুটি বাইভ্যালেন্ট “বিষুবীয় তলে” সাজাও, তারপর সমসংস্থ ক্রোমোসোম দুই দিকে টেনে আলাদা করো (অ্যানাফেজ-১)। প্রতি পাশে কয়টি ক্রোমোসোম, কয়টি ক্রোমাটিড? কোন ক্রোমাটিডে দুই রং?
বইয়ের দলগত কাজের (পৃ. 92: পাঁচ দল, প্রতি দল একটি উপপর্যায়) পোস্টারের জন্য এই ছবিগুলোই ব্যবহার করতে পারো।
নিরাপত্তা: কাঁচি সাবধানে ব্যবহার করো; পাইপ-ক্লিনারের ধারালো তারের প্রান্ত ভাঁজ করে দাও বা টেপ মুড়ে দাও, যাতে হাতে না বেঁধে। ছোট বোতাম ছোট ভাইবোনের নাগালের বাইরে রাখো।
পরীক্ষার প্রস্তুতি
১. (জ্ঞান) সংজ্ঞা লেখো: সিন্যাপসিস, বাইভ্যালেন্ট, টেট্রাড, কায়াজমা, প্রান্তীয়করণ, ইন্টারকাইনেসিস।
উত্তর দেখো
- সিন্যাপসিস (synapsis): জাইগোটিনে সমসংস্থ ক্রোমোসোমের দৈর্ঘ্য বরাবর জোড়া বাঁধা (সিন্যাপটোনেমাল কমপ্লেক্সের মাধ্যমে)।
- বাইভ্যালেন্ট (bivalent): সিন্যাপসিসে জোড়া বাঁধা একজোড়া সমসংস্থ ক্রোমোসোম; সংখ্যা = n।
- টেট্রাড (tetrad): প্যাকাইটিনে বাইভ্যালেন্টের চারটি ক্রোমাটিড একসাথে।
- কায়াজমা (chiasma): ডিপ্লোটিনে দুই নন-সিস্টার ক্রোমাটিডের X-আকৃতির সংযোগবিন্দু — ক্রসিংওভারের দৃশ্যমান চিহ্ন।
- প্রান্তীয়করণ (terminalisation): ডিপ্লোটিন থেকে ডায়াকাইনেসিসে কায়াজমার ক্রোমোসোমের প্রান্তের দিকে সরে যাওয়া।
- ইন্টারকাইনেসিস (interkinesis): মায়োসিস-১ ও মায়োসিস-২-এর মাঝের সংক্ষিপ্ত বিরতি, যাতে DNA প্রতিলিপন হয় না।
২. (অনুধাবন) গ্যামেটিক, স্পোরিক ও জাইগোটিক মায়োসিসের পার্থক্য উদাহরণসহ লেখো।
উত্তর দেখো
গ্যামেটিক (অন্তিম): গ্যামেট তৈরির ঠিক আগে ঘটে; জীবের দেহ ডিপ্লয়েড, শুধু গ্যামেট হ্যাপ্লয়েড — যেমন মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী। স্পোরিক (মধ্যবর্তী): স্পোর তৈরির সময় ঘটে; ডিপ্লয়েড স্পোরোফাইট ও হ্যাপ্লয়েড গ্যামেটোফাইট দুই প্রজন্ম থাকে — যেমন সপুষ্পক উদ্ভিদের পরাগধানী ও ডিম্বক, ফার্ন, মস। জাইগোটিক (প্রারম্ভিক): নিষেকের পর জাইগোটেই ঘটে; জাইগোট ছাড়া সারা জীবন হ্যাপ্লয়েড — যেমন Chlamydomonas, অনেক ছত্রাক।
৩. (অনুধাবন, খ) মায়োসিস-১-কে হ্রাসমূলক বিভাজন বলা হয় কেন?
উত্তর দেখো
মায়োসিস-১-এর অ্যানাফেজে সমসংস্থ ক্রোমোসোম জোড়ার দুই সদস্য (প্রতিটি দুই ক্রোমাটিডসহ, সেন্ট্রোমিয়ার অবিভক্ত) বিপরীত মেরুতে যায়। ফলে প্রতিটি অপত্য নিউক্লিয়াস জোড়ার একটি করে, অর্থাৎ n সংখ্যক ক্রোমোসোম পায় — 2n থেকে n-এ হ্রাস। মানুষে 46 → 23। (মায়োসিস-২-এ সংখ্যা n-ই থাকে, তাই সেটি সমীকরণিক।)
৪. (বহুনির্বাচনি) (ক) কোন উপপর্যায়ে সিন্যাপসিস ঘটে? (খ) ক্রসিংওভার? (গ) প্রান্তীয়করণ সম্পূর্ণ হয়? (ঘ) 2n = 24 এমন কোষে মেটাফেজ-১-এ কয়টি বাইভ্যালেন্ট? (ঙ) মায়োসিসের বর্ণনা প্রথম কে দেন?
উত্তর দেখো
(ক) জাইগোটিন। (খ) প্যাকাইটিন। (গ) ডায়াকাইনেসিস (শুরু ডিপ্লোটিনে)। (ঘ) 12টি (= n)। (ঙ) অস্কার হার্টউইগ, 1876 (সামুদ্রিক আর্চিনের ডিম); Ascaris-এ গ্যামেটে অর্ধেক ক্রোমোসোম দেখান ভ্যান বেনেডেন, 1883।
৫. (প্রয়োগ, সংখ্যাগত) মানুষের একটি প্রাইমারি স্পার্মাটোসাইটের G1 দশায় DNA 6.4 pg। (ক) প্যাকাইটিনে, (খ) টেলোফেজ-১-এর প্রতিটি নিউক্লিয়াসে, (গ) শুক্রাণুতে DNA, ক্রোমোসোম ও ক্রোমাটিড কত?
উত্তর দেখো
- (ক) প্যাকাইটিন: S দশায় কপি হয়েছে, তাই DNA 12.8 pg (4C); 46টি ক্রোমোসোম, 92টি ক্রোমাটিড, 23টি বাইভ্যালেন্ট।
- (খ) টেলোফেজ-১ নিউক্লিয়াস: 6.4 pg (2C); 23টি ক্রোমোসোম, 46টি ক্রোমাটিড।
- (গ) শুক্রাণু: 3.2 pg (1C); 23টি ক্রোমোসোম, 23টি ক্রোমাটিড (DNA অণু)।
৬. (সৃজনশীল, ঘ) উদ্দীপক: কোষ A-তে 2n = 8; এটি বিভাজিত হয়ে দুটি কোষ B তৈরি করল, যাদের প্রতিটিতে 4টি ক্রোমোসোম, প্রতিটি ক্রোমোসোমে দুটি ক্রোমাটিড। “B কোষে অপত্য কোষে ক্রোমোসোম অর্ধেক কেন?” — চিত্রসহ বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
B কোষে 4 = n ক্রোমোসোম, প্রতিটিতে দুটি ক্রোমাটিড — এটি মায়োসিস-১-এর ফল (মাইটোসিস হলে 8টি ক্রোমোসোম থাকত)। কারণ:
- মায়োসিসের আগের S দশায় প্রতিটি ক্রোমোসোম দুই ক্রোমাটিড পায় (8 ক্রোমোসোম, 16 ক্রোমাটিড)।
- জাইগোটিনে সমসংস্থ জোড়া বাঁধে → 4টি বাইভ্যালেন্ট; প্যাকাইটিনে ক্রসিংওভার, ডিপ্লোটিনে কায়াজমা জোড়াগুলোকে আটকে রাখে।
- মেটাফেজ-১-এ বাইভ্যালেন্ট বিষুবীয় তলে; প্রতিটি সমসংস্থের দুই সিস্টার কাইনেটোকোর একই মেরুর দিকে।
- অ্যানাফেজ-১-এ সেন্ট্রোমিয়ার ভাগ না হয়ে পুরো সমসংস্থ ক্রোমোসোম বিপরীত মেরুতে যায় — প্রতি মেরুতে জোড়ার একটি করে, 4টি।
চিত্র: একটি কোষে দুই রঙের চারটি জোড়া (বাইভ্যালেন্ট) বিষুবীয় তলে → দুই মেরুতে চারটি করে দুই-ক্রোমাটিড ক্রোমোসোম (উপরের ল্যাবের অ্যানাফেজ-১ দৃশ্যের মতো)। তাই B-তে ক্রোমোসোম অর্ধেক (n = 4) কিন্তু DNA 2C; মায়োসিস-২-এ সিস্টার আলাদা হয়ে 1C হবে। এই অর্ধেক হওয়াই নিশ্চিত করে যে নিষেকের পর জাইগোটে আবার 2n = 8 ফিরে আসবে।